চীন ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের প্রথাগত সম্মুখ লড়াই হয়েছিল একবারই, ১৯৬২ সালে। কিন্তু ঐ যুদ্ধের পর বিগত দশকগুলোতে এশিয়ার এই দুটি দেশ বিপুল সমরাস্ত্র সম্ভার গড়ে তুলেছে, পরমাণু শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে বৈরিতাও বাড়ছে। লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে সেনা হতাহতের ঘটনায় সেই বৈরিতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সুযোগে বহির্বিশ্বের নজর পড়েছে লাদাখে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি চীনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। রাশিয়ার ভূমিকা এখন পর্যন্ত রহস্যজনক। ব্রিটেন উদ্বেগ প্রকাশ করে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মিটিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়েছে।
উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
দুই পক্ষই বলছেন যে অন্য পক্ষের সেনাবাহিনী তাদের আগের অবস্থান থেকে সামনে এগিয়ে এসে ভূমি দখল করেছেন এবং সেকারণেই হাতাহাতি-মারামারি হয়েছে। দুই পক্ষই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রাখছে। কারা যে কোন এলাকায় ঢুকেছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে দুই পক্ষই তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা ছেড়ে দিতে একেবারেই রাজি নয় এবং প্রয়োজনবোধে তারা হাতাহাতি করবেন। সেটা তারা করেছেন। তবে গোলাগুলি হয়েছে এমনটা শোনা যায়নি। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা গতকাল জানিয়েছে, পেট্রোলিং পয়েন্ট (পিপি)-১৪ কে ঘিরে প্রাণ হারিয়েছিল ভারতের ২০ জন সেনা, তার কাছে ফের ভারতের এলাকা দখল করে বসে পড়েছে চীনের সেনাবাহিনী। এরই মধ্যে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, লাদাখের স্থিতাবস্থা বদলের চেষ্টার ফল ভুগতে হতে পারে চীনকে। আবার বেইজিং বলেছে, সীমান্ত পরিস্থিতি খারাপের দিকে নিয়ে যাওয়াটা ভারতের জন্য উচিত হবে না।
দুই দেশ সেনা সরানোর ব্যাপারে ঐকমত্য হলেও সেনা সরানোর কোনো দৃশ্য গতকাল পর্যন্ত দেখা যায়নি। বরং লাদাখের আকাশে যুদ্ধবিমান উড়ছে। দুই দেশই সেনাবাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম মজুত করছে। স্যাটেলাইটে ভারতের জায়গায় চীনের অবকাঠামো নির্মাণের দৃশ্য ধরা পড়েছে। আবার ভারতও লাদাখে রাস্তা নির্মাণ করছে। এ নিয়ে লে শহরের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। যদিও লে শহরের বাসিন্দারা শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন।
কেবলই সীমান্ত বিরোধ!
সেনবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনী যা কিছু করে, তার পেছনে একটা রাজনৈতিক-কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট থাকে। বর্তমানে ভারত এবং চীনের মধ্যে যে সম্পর্ক, সেটা বিশ্বজনীন প্রেক্ষাপটে বেশ বৈরী। বিশ্ব রাজনীতিতে এই দু্?ই দেশের অবস্থান দুই প্রতিদ্বন্দ্বি শিবিরে। আন্তর্জাতিকভাবে চীনের সেই অর্থে কোনো মিত্র নেই। তাদের একটি মিত্রদেশ পাকিস্তান। ১৯৯৯-২০০০ সাল হতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সামরিক সহযোগিতা গত দুই দশকে অনেক দৃঢ় হয়েছে। ভারত বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কয়েকটি সামরিক জোটে অংশগ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে বেশ বৈরী, ভারত-মার্কিন সামরিক সহযোগিতাকে তাই তারা মোটেই পছন্দ করছে না। চীন এবং ভারতের মধ্যে বৈরিতার এরকম একটা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে। সেই আলোকে দেখতে গেলে এই সীমান্ত বিরোধ তাদের মধ্যকার শত্রুতার একটি প্রকাশ মাত্র।
বিশ্ব শক্তি : কে কার পক্ষে
ভারতের মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই চীনের বিরোধিতায় নেমেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েকবার মধ্যস্ততার প্রস্তাব দিলেও চীন ও ভারত দুই দেশই প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তার পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনকে মোকাবিলায় দক্ষিণ চীন সাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, এশিয়ার দেশ ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ মিত্র দেশগুলোকে রক্ষায় এবং চীনের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ঠেকাতে সেনা মোতায়েন করার পরিকল্পা করছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্টের ট্রাম্পের ইঙ্গিতেই করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এজন্য ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে আনা হচ্ছে।
সম্প্রতি রাশিয়া, ভারত ও চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের একটি সম্মেলন হয়েছে। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ভারত ও চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত হয়নি। ঐ সম্মেলন শেষে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্ততা করার প্রয়োজন নেই। গতকাল ভারতের মিডিয়া ইন্ডিয়া টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারত-চীন দুই পক্ষকে নিয়ে বসার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যায় রাশিয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়া কাকে শেষ পর্যন্ত সমর্থন করবে তা নিয়ে ধোঁয়াশায় গোটা বিশ্ব। এমনকি রাশিয়া নিজেও ধন্দে রয়েছে। কারণ, ভারত তার পুরোনো বন্ধু। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্ক এখন ভালো। তাই রাশিয়া পুরোনো মিত্র নাকি নতুন মিত্রের পাশে দাঁড়াবে তা ঠিক করে উঠতে পারেনি।
ভারতের পাশে আমেরিকা দাঁড়ালে পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া দাঁড়াবে চীনের পেছনে। ভারত-চীন যুদ্ধ যদি শেষ পর্যন্ত বাধেই সে ক্ষেত্রে শুধু আমেরিকা নয়, জাপান, অস্ট্রেলিয়াও ভারতের পক্ষ নেবে। দুই দেশের সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে ইউরোপের দেশগুলো এখনো চুপ। কেবল ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন পার্লামেন্টে এক প্রশ্নের জবাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভারত ও চীনকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রতিবেশী দেশকে কাছে টানছে চীন!
গত ২০ জুন আনন্দবাজার পত্রিকা এক প্রতিবেদনে জানায়, লাদাখে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষে উত্তাপ ছড়ানোর পরে ফের নতুন উদ্যমে প্রতিবেশি দেশগুলোকে কাছে টানছে বেইজিং। বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া অতিরিক্ত ৫ হাজার ১৬১টি পণ্যে শুল্ক না নেওয়ার কথা জানিয়েছে চীন। বাংলাদেশ একমাত্র প্রতিবেশী দেশ, নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও যাদের সঙ্গে ভারতের একটা পরীক্ষিত সুসম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণে শ্রীলঙ্কা-মালদ্বীপ থেকে উত্তরে নেপাল-ভুটান, কারো সঙ্গেই আর আগের উষ্ণ সম্পর্ক নেই ভারতের। কূটনীতিকরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে চীনের হাত স্পষ্ট। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিষিয়ে দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে একঘরে করে ফেলার কৌশল বাস্তবায়িত করছে বেইজিং।
