আমাদের দেশে ‘সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হওয়া’ বলিয়া একটি প্রবচন আছে। বাংলা ভাষায় সাত ও তেরো বহু অর্থে প্রযুক্ত হয়। ইহার অর্থ বহু সাগর ও নদী পার হইয়া বিস্তীর্ণ ভূভাগ অতিক্রম করা বা অনেক দূর দেশ হইতে আসা। যাহারা সাম্রাজ্যবাদী তাহারা নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠায় এই সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হইয়া আসিতেও কুণ্ঠিত হন না। কিন্তু একসময় না একসময় তাহারা ঠিকই ধরাশয়ী হন। এই জন্য আমরা বলি, ‘সুখে থাকিলে ভূতে কিলায়’। অনেক সময় ভালো থাকিলেও ইচ্ছা করিয়া ও অকারণে নিজেদের দুঃখ ডাকিয়া আনি। পৃথিবীতে একটি দেশ শৌর্যবীর্যে ছিল অতুলনীয়। হঠাত্ তাহার বিশ্বমানচিত্র বদলাইয়া দেওয়ার শখ হইল। ব্রিটেন পারিলে সে পারিবে না কেন? অতঃপর একের পর এক যুদ্ধবিগ্রহে জড়াইয়া পড়িয়া, লক্ষ লক্ষ লোক হত্যা করিয়া এবং অসংখ্য মানুষকে ঘরছাড়া-লক্ষ্মীছাড়া করিয়া দিন শেষে আজ বিশ্বে সে বড় একা হইয়া পড়িয়াছে। আজ তাহার নিজ ঘরেই অশান্তি। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাহার নিকট হইতে মুখ ফিরাইয়া লইয়াছে। কী দরকার ছিল এত যুদ্ধবিগ্রহের? আজ ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হইতে বাহির করিয়া দেওয়া হইতেছে। এই প্রক্রিয়ার কিতাবি নাম ব্রেক্সিট। হিটলারও তো তাহাই চাহিয়াছিলেন। অথচ তাহার বিরোধিতা করিতে গিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হইল। মধ্যখান হইতে মারা গেল লক্ষ লক্ষ মানুষ!
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র রপ্তানির হিড়িক পড়িয়া গেল। ইহাকে কেন্দ্র করিয়া দেখা দিল কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধ। তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশের অবস্থা সঙ্গিন হইয়া পড়িল। একসময় সমাজতন্ত্রের পতন হইল। একক পরাশক্তিও দুর্বল হইয়া পড়িল। এখন গণতন্ত্রও নাই, সমাজতন্ত্রও নাই। মধ্যখান হইতে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ গেল! ভেনেজুয়েলায় মার্শাল ল জারি করা হইল কাহাদের ইশারায়? কাহারা তুরস্কে সরকার পরিবর্তনের কলকাঠি নাড়িলেন? এই ধরনের বহু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে। আজ বলিতে লজ্জা হয়, দুঃখও হয়—যেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আনন্দোল্লাস করা হইয়াছিল, সেই দেশটির প্রেসিডেন্টই এখন সম্রাটের ভূমিকায় অবতীর্ণ। পূর্বের একক পরাশক্তির অধিকারী দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতিবার জন্য তাহার নিকট ধরনা দেন। কাশ্মীর নিয়া তিনি সমঝোতা করিয়া দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও কেহ গ্রাহ্য করিলেন না। আজ আমাদের দুইটি বৃহত্ প্রতিবেশী দেশ যখন সীমান্তদ্বন্দ্বে মুখোমুখি অবস্থানে, তাহারা তখন মীমাংসার জন্য কাহার নিকট ছুটিয়া গেলেন তাহাও আজ অজানা নহে। তাসখন্দ শান্তিচুক্তির বেলায়ও একই ঘটনা ঘটিয়াছিল।
প্রাচীন এমনকি মধ্যযুগে বিশ্ব জয় করা ছিল অনেকের নেশা। যুদ্ধের মাধ্যমে সরাসরি দেশ দখল করা হইত। আধুনিক ও তথাকথিত সভ্যতার যুগে অপ্রত্যক্ষভাবে চলে এই প্রভাব বিস্তারের খেলা। এখন সামান্য হইলেও প্রত্যেকের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা রহিয়াছে। তাই একতরফাভাবে পিটাইয়া দেশ দখলের সুযোগ আর নাই। এই জন্য আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়ামেন প্রভৃতি দেশ হইতে শক্তিধর দেশগুলির শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে। আমরা যদি অন্যের ঘরে আগুন লাগাই, তাহা হইলে সেই আগুন একদিন আমার নিজের ঘরেও লাগিতে পারে। আমরা যদি অন্যের ঘুম কাড়িয়া লই, তাহা হইলে নিজেদের ঘুমও একদিন হারাম হইয়া যাইতে পারে। অতএব, পৃথিবীব্যাপী দাপাইয়া বেড়ানো শক্তিসমূহের প্রতি আহ্বান—আপনারা ভালো থাকুন, অন্যদেরও ভালো থাকিতে দিন। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের অন্তিম মুহূর্তের স্বগতোক্তির সুরে বলিতে হয়—‘সুখে থাকো ভাইসব’।
