বাসা থেকে নমুনা নিয়ে করোনার ভুয়া রিপোর্ট

আপডেট : ২৮ জুন ২০২০, ২৩:৩৭

ওরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনা রোগীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। জনপ্রতি নিত ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা করে। করোনার নমুনা পরীক্ষা করতে হয় আরটি পিসিআর ল্যাবে। কিন্তু ওরা কম্পিউটারে তৈরি করা মনগড়া রিপোর্ট রোগীর কাছে পাঠাত। এভাবে করোনা টেস্ট করার নামে মানুষের জীবন নিয়ে খেলায় মেতে উঠেছিল বেসরকারি নমুনা সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (জেকেজি হেলথ কেয়ার)। ওভাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান জেকেজি হেলথ কেয়ার। ওভাল গ্রুপের চেয়ারম্যান হলেন জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউটের ডা. সাবরিনা সুলতানা। তার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরী জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

আইইডিসিআরের অনুমোদন নিয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে  করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য ৪৪টি বুথ স্থাপন করে। এসব এলাকা থেকে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হতো। শর্ত ছিল—সরকার নির্ধারিত ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠাতে হবে। গুলশানের কনফিডেন্স টাওয়ারের ১১, ১৪ ও ১৫ তলায় জেকেজি হেলথ কেয়ারের অফিস। কিন্তু আরিফুল ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা বুকিং বিডি ও হেলথ কেয়ার নামে দুটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। ডা. সাবরিনা ও তার স্বামীর নিজস্ব কর্মীবাহিনী ছাড়াও সিন্ডিকেটে যোগ দেয় দালালচক্র। ফোন করলেই বাসায় গিয়ে চক্রের সদস্যরা সংগ্রহ করে করোনার নমুনা। এর বিনিময়ে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নিত। কিন্তু নমুনার কোনো পরীক্ষা ছাড়াই এক দিন পরই মনগড়া ফল দিয়ে দিত।             এভাবে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

গত ২৩ জুন তেজগাঁও থানা পুলিশ জেকেজি হেলথ কেয়ারের আরিফুল চৌধুরী, হুমায়ন কবীর, হুমায়নের স্ত্রী তানজিনা পাটোয়ারিসহ ছয় জনকে গ্রেফতার করে। গুলশানে পুলিশের ঐ অভিযান চলাকালে ডা. সাবরিনা সুলতানা পালিয়ে যান। ঐ ছয় জনকে তেজগাঁও থানায় নিয়ে আসা হয়। ঐ দিন রাতেই আরিফুলের ক্যাডার বাহিনী আসামিদের ছিনিয়ে নিতে তেজগাঁও থানায় হামলা চালায়। থানার কলাপসিবল গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। ঐ ঘটনায় পুলিশ থানার  ভেতর থেকে ১৮ জনকে গ্রেফতার করে। পরদিন আদালতে হুমায়ন কবীর ও তার স্ত্রী  তানজিনা এ ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আরিফুলসহ চার জনকে পুলিশ দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

জিজ্ঞাসাবাদকারী এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আরিফুল ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা মাদকাসক্ত। বিশেষ করে তারা ইয়াবা সেবনকারী। গত মে মাসে সরকারি তিতুমীর কলেজের করোনা বুথে রাতের বেলায় তারা ইয়াবার আসর বসিয়েছিল। ছাত্রলীগ বিষয়টির প্রতিবাদ করলে ডা. সাবরিনার ক্যাডার বাহিনী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বেদম মারধর করে। তারা বিভিন্ন বুথে রাতের বেলায় মদ ও ইয়াবার আসর বসাত। এসবের খবর পেয়েই তেজগাঁও থানা পুলিশ গুলশানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।

জিজ্ঞাসাবাদে আরিফুল চৌধুরী জানিয়েছেন, রাজধানীতে এরকম কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে যারা ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে করোনা নমুনা সংগ্রহ করছে এবং ভুয়া রিপোর্ট দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের সহকারী কমিশনার মাহমুদ খান বলেন, আরিফুল চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে এ ঘটনার সঙ্গে তার স্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন। তবে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। কাগজে কলমে জেকেজি হেলথ কেয়ারের সঙ্গে ডা. সাবরিনার সংশ্লিষ্ট থাকার প্রমাণ পাইনি। তবে আরিফুলের সিন্ডিকেটের আরো বেশ কয়েক জন সদস্যকে আমরা খুঁজছি।