কুয়েতে মানব ও অবৈধ মুদ্রা পাচারের অভিযোগে দেশটির কারাগারে বন্দি বাংলাদেশের সংসদ সদস্য (লক্ষ্মীপুর-২) কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের কাছে নির্বাচনের আগে অর্থের বিনিময়ে আসন বেচে দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত মোহাম্মদ নোমানকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের গতকাল রবিবার তার উপদেষ্টা ও দলটির সাবেক এমপি নোমানকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদবি থেকে অব্যাহতি দেন। জাপার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘এই আদেশ ইতোমধ্যেই কার্যকর হয়েছে’।
জাপার দায়িত্বশীল একাধিক নেতা গতকাল ইত্তেফাককে জানান, ৬ জুন কুয়েত সিটির মুশরিফ এলাকার বাসা থেকে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র এমপি পাপুলকে আটকের পর কুয়েত ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে ফলাও করে। এসব প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে অর্থের বিনিময়ে আকস্মিকভাবে নির্বাচন থেকে নোমানের সরে দাঁড়ানোর ঘটনাপ্রবাহ উঠে এসেছে। দশম সংসদের সদস্য নোমান পরবর্তী নির্বাচনেও মহাজোটের মনোনয়ন পাওয়ার পরেও কেন হঠাত্ সরে গেলেন—সেটি তখনই বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয় জাপার কেন্দ্রীয় ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের নেতাকর্মীদের মধ্যে। কিন্তু তখন জাপার প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের অসুস্থতা ও নির্বাচনি ব্যস্ততার কারণে বিষয়টি ততটা তলিয়ে দেখতে পারেননি দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। তখন সন্দেহ কিংবা আঁচ করতে পারলেও পাপুল কুয়েতে ধরা পড়ার পরবর্তী ঘটনাক্রমে মূল বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেই দল থেকে নোমানকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পাপুলের সঙ্গে আসন-সমঝোতা ও দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে জানার জন্য গতকাল একাধিকবার ফোন করেও নোমানের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
কুয়েতের কারাগারে বন্দি লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পাপুল দেশ জুড়ে প্রথম আলোচনায়ও আসেন ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে। ঐ আসনের দশম সংসদের সদস্য ও জাপা নেতা মোহাম্মদ নোমানের হঠাত্ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা এবং নোমানের ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রহস্যজনকভাবে অবস্থান বদলে ‘আপেল’ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী পাপুলকে সমর্থন জানানোর ঘটনা তখন বহু আলোচনার জন্ম দেয়।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে লক্ষ্মীপুর-২ আসনে দলের তখনকার এমপি মোহাম্মদ নোমানকে দলীয় মনোনয়ন দিয়ে ‘লাঙ্গল’ প্রতীক বরাদ্দ দেয় জাপা। নোমান ছিলেন মহাজোটের প্রার্থী। ১৯ ডিসেম্বর হঠাত্ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বিজ্ঞপ্তি’ দিয়ে ভোটের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। তখনই এলাকার সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতারা এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, ‘এখানে টাকার খেলা হয়েছে।’ পাপুলের কাছ থেকে নোমান ‘টাকা নিয়েছেন’, এমনটাই তখন ছিল সবার মুখে মুখে। এমনকি কারো কারো মন্তব্য ছিল, ‘১২ কোটি টাকার খেলা’। এ নিয়ে তখন গণমাধ্যমেও একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যদিও ‘টাকার খেলা’ হওয়ার বিষয়টি তখন অস্বীকার করেছিলেন নোমান ও পাপুল দুই জনই।
তখনকার এমপি নোমান কেন নির্বাচন থেকে সরে গেলেন, সেটিই ছিল তখন রায়পুরের মানুষের প্রধান আলোচনার বিষয়। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তিতে নোমান নিজ দল জাপার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, লক্ষ্য নির্ধারণে অনিশ্চয়তা, কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয় ও সিদ্ধান্তহীনতার কথা উল্লেখ করেন। সরে যাওয়ার বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়ে নোমানকে নোটিশও দেয় জাপা। ব্যাখ্যায়ও নোমান একই কারণ উল্লেখ এবং টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছিলেন।
বিপুল অর্থের বিনিময়ে নোমানের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৮ সালের নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে, ২২ ডিসেম্বর। ঐদিন শহরের তাজমহল সিনেমা হলের সামনে দলের জরুরি সভায় আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি গোলাম ফারুক প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নোমান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।...অনেক টাকা, অনেক টাকা।’ তার ঐ বক্তব্য নিয়ে সেদিনের সভায় নেতাদের মধ্যে বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। তখনকার জাপা দলীয় এমপি নোমানের ব্যক্তিগত সহকারী শাহ আলম নিজেও তখন গণমাধ্যমের কাছে বলেছিলেন, ‘পাপুলের কাছ থেকে ১২ কোটি টাকা নিয়ে তিনি (নোমান) সরে দাঁড়িয়েছেন বলে আমরা শুনেছি। তবে ওনাকে (নোমানকে) কয়েকদিন ধরে ফোনেও আমরা পাচ্ছি না।’ আর নোমানের সঙ্গে টাকার লেনদেনের বিষয়ে পাপুল তখন বলেছিলেন, ‘উনি ফাইন্যান্সিয়ালি (আর্থিকভাবে) দুর্বল। নির্বাচনে থাকলে বড়োজোর ৫ হাজার ভোট পেতেন। এসব বুঝেই উনি সরে দাঁড়ান। এখানে লেনদেনের ঘটনা ঘটেনি।’ এভাবেই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নির্বিঘ্নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যান পাপুল।
