বিশ্বব্যাপী শরণার্থীর সংখ্যা হুহু করিয়া বাড়িতেছে। বাড়িতেছে শরণার্থীর প্রকারভেদও। পূর্বে আমরা শরণার্থী বলিতে বুঝিতাম এক দেশ হইতে অন্য দেশে রাজনৈতিক কারণে অথবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আশ্রয় প্রার্থনাকারীকে। এই ধরনের আশ্রয়প্রার্থীকেই সাধারণত জাতিসংঘের হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর) আশ্রয়প্রার্থীর মর্যাদা দিয়া আসিতেছিল; কিন্তু বর্তমানে অর্থনৈতিক চরম বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক মন্দা এবং অতিসম্প্রতি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে যে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ও স্থানচ্যুতি ঘটিতেছে তাহাও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশকে উদ্বিগ্ন করিয়া তুলিয়াছে। উহারাও এখন শরণার্থী হিসাবে বিবেচিত হইতেছে।
জ্ঞাত ইতিহাসে সর্বদাই শরণার্থী দেখা গিয়াছে। এক দেশে দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ ছুটিয়াছে অন্য দেশে, অত্যাচারী শাসক দ্বারা বিতাড়িত হইয়াছে, আবার বহিঃশত্রুর আক্রমণ হইতে জীবন বাঁচাইতেও মানুষ দেশান্তরী হইয়াছে; কিন্তু জনবহুল বিশ্বে বর্তমান যে বৈচিত্র্যপূর্ণ কারণ যোগ হইয়াছে তাহাতে অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়াছে শরণার্থীর সংখ্যা। সিরিয়ার জনগণ নিজ দেশে ভালোই ছিল। হঠাত্ আরব বসন্তের সময় অস্থির হইয়া উঠা সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত একটি আন্তর্জাতিক যুদ্ধে রূপ লইয়াছে। লক্ষ লক্ষ সিরীয় জীবন দিল এবং ৪০ লক্ষাধিক সিরীয় নাগরিক বাস্তুচ্যুত হইয়া পড়িল। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়া ইউরোপে গেল ১০ লক্ষাধিক। লেবানন, তুরস্কে আশ্রয় লইয়াছে কয়েক লক্ষ। ইহার সহিত অভ্যন্তরীণ ডিসপ্লেসমেন্ট দেখা দিল ব্যাপক আকারে। একদিকে খরা ও দুর্ভিক্ষ, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সন্ত্রাসী হামলায় আফ্রিকার অনেক দেশে সম্প্রতি সৃষ্টি হইয়াছে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী, যাহাদের বড় অংশ ইউরোপের দিকে ধাবমান। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সম্প্রদায়গত অস্থিরতায় ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় লইয়াছে বাংলাদেশে, যাহাদের বড় অংশের সহায়তায় আগাইয়া আসিয়াছে জাতিসংঘসহ বেশ কিছু দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। সংখ্যায় যতই হোক, এতদিন পর্যন্ত সব ধরনের শরণার্থীর একটি হিসাব রাখা সম্ভব হইয়াছে; কিন্তু বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারণে যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী সৃষ্টি হইতেছে তাহার ব্যবস্থাপনা করিবার উপায়ও থাকিবে বলিয়া মনে হয় না। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি সম্প্রতি জানাইয়াছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে ইতিমধ্যে ৭১ মিলিয়ন, অর্থাত্ ৭ কোটির অধিক মানুষ শরণার্থীতে পরিণত হইয়াছে। এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়িবে বলিয়া তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শরণার্থী সমস্যা বরং আরো প্রকট হইয়া উঠিতেছে। বিদেশ হইতে কর্ম হারাইয়া দেশে প্রবেশ করিয়াছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। শহর অঞ্চলে যাহারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন তাহাদের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে কর্ম হারাইয়া দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছেন। কর্মস্থল ছাড়িয়া তাহারা গ্রামে প্রবেশ করিতেছেন। তাহাদেরও শরণার্থী বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। এখন প্রশ্ন হইল, এই পরিস্থিতি মোকাবিলার উপায় কী? সত্যি কথা বলিতে কি, পুনরায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হইলে এই ব্যাপক জনগোষ্ঠী দেশের বোঝায় পরিণত হইবে। সুতরাং সরকারের উচিত হইবে—যে করিয়া হউক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প টিকাইয়া রাখিয়া কর্মসংস্থানের প্রবাহকে ধরিয়া রাখিতে হইবে। কাজটি সহজ নহে আমরা জানি; কিন্তু স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সহিত চেষ্টা করিলে কিছুটা সফলতা আসিবে, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই। এই পথেই আপত্কালীন রক্ষাকবচ তৈরি করিতে হইবে।
