নারীর প্রতি সহিংসতার শেষ কোথায়

আপডেট : ২৯ জুন ২০২০, ২১:৩৬

মো. শফিকুল ইসলাম নিয়ামত

আশঙ্কাজনকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলছে। খুন, গুম, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং যৌতুকের দাবিতে পারিবারিক নির্যাতনের খবর আমরা প্রতিনিয়ত পত্রিকায় পড়ছি। প্রাণঘাতী করোনা মহামারিতেও নারীর প্রতি নৃশংস এবং অমানবিক আচরণ থেমে নেই। গত ১২ জুন লক্ষ্মীপুরে ঘটে যাওয়া মর্মস্পর্শী একটি ঘটনা প্রায় সবাই জানি। বাবা ক্যানসারে আক্রান্ত। মেয়েকে নানার বাড়ি রেখে মা ঢাকায় বাবার কাছে যায়। বাবার সেবায় তার প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে বাড়িতে আসে মেয়েটি। মেয়েটিকে একা পেয়ে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কিছু দিন আগে ময়মনসিংহে এক জনকে ধর্ষণের পর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করে ধর্ষণকারীরা। গত ২৪ জুনে একটি পত্রিকায় একটি সংবাদে শিরোনাম ছিল—চাঁদপুরে স্বামীর গলায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গৃহবধূকে ধর্ষণ। ২৫ জুনে অপর একটি পত্রিকায় আরেকটি শিরোনাম ছিল, সাভারে নারীশ্রমিককে গণধর্ষণ। প্রতিদিন সিরিজ আকারে ধর্ষণের খবর প্রকাশ হচ্ছে পত্রিকায়। একটি দিনও পত্রিকার পাতায় নারী নির্যাতনের খবর বাদ যায় না। যেসব খবর সামনে আসে সেগুলো আমরা জানতে পারি। এরকম শত শত ঘটনা পর্দার আড়ালে থেকে যায়। কত অমানবিক, হিংস্র এবং জঘন্য হলে এরকম নৃশংস ঘটনা ঘটানো যায়। বৃদ্ধা থেকে শুরু করে শিশুরা পর্যন্ত বাদ যাচ্ছে না ধর্ষণের কবল থেকে। সমাজে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টা অনেক জটিল আকারে দেখা দিয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়েও এরকম বিকৃত কর্মকাণ্ড ঘটে থাকে।

গত মে মাসের ৩১ দিনের হিসাব দেখেই তো নির্যাতনের চিত্র অনুমান করা যায়। আর এর বাইরে যে কত নির্যাতন হয়েছে সেটা তো অনুমানের বাইরে। পারিবারিকভাবে নির্যাতনের চিত্র আরো ভয়াবহ। গত ২৭ মার্চে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে স্ত্রীর মুখে এসিড ছুড়ে মারে স্বামী। ১৯ জুনে জয়পুরহাটে স্বামী এবং প্রথম স্ত্রীর হাতে খুন হন আরেক গৃহবধূ। ২০ জুন সিরাজগঞ্জে যৌতুকের কারণে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার হন স্বামী। অর্থাত্ প্রতিদিনই এরকম শত শত ঘটনা ঘটছে। সারা পৃথিবীতে করোনার ভয়ে সবাই ভীত হলেও নির্যাতনকারীদের মনে কোনো প্রভাব নেই করোনার। থাকলে কি আর এরকম মহামারিতেও তাদের নৃশংস কর্মকাণ্ড অবিরত থাকে। লকডাউনে বাড়িতে থাকা পুরুষ সব কাজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা থেকেই এরকম ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ; কিন্তু শুধু লকডাউনেই কি এরকম নির্যাতন হয়? নির্যাতনের এই ধারাবাহিকতা তো আজকের নয় অথবা লকডাউনে নতুন নয়। সমাজে নারীর প্রতি এই রকম নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের পিছনে কারণ অনুসন্ধান করলে আমরা দৃষ্টিভঙ্গির কথা আলোচনা করতে পারি। সামাজিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার চরম অবক্ষয় নারীজাতির সম্মান বিনষ্ট করেছে। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতার কারণে যুবসমাজ তাদের কুবাসনা অনৈতিক উপায়ে চরিতার্থ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর সাংবিধানিকভাবে যে নীতিমালা আছে সেটার সুষ্ঠু প্রয়োগ হচ্ছে না। নারীর সম্মান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষকের এবং নারী নির্যাতনকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নারীকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সভা-সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। সর্বোপরি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইন প্রয়োগে কোনো প্রতিবন্ধকতা রাখা যাবে না। প্রতিবন্ধকতা থাকলে সহিংসতা রোধ সম্ভব হবে না। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়