কেমন যাবে ২০১৯ সালের অর্থনীতি?

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৩১

২০১৮ সাল শেষ হলো, খুবই বড় ঘটনা দিয়ে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩০ ডিসেম্বর। মাঝখানে চারদিন। আজ শুক্রবার, ২০১৯ সালের চতুর্থদিন। আবার আর্থিক সাল দিয়ে বিচার করলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস শেষ। শুরু হয়ে গেছে দ্বিতীয়ার্ধ। শুরুটা হলো শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। নতুন সরকার গঠিত হবে অবিলম্বে। অবশ্যই নতুন আশাবাদ নিয়ে। এমনিতেই স্বাভাবিক প্রশ্ন বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন তো গেল, গেল বেশ ভালোভাবেই। সকল দলই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। খুবই আশাপ্রদ ঘটনা। এখন প্রশ্ন অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন যাবে? কেমন যাবে ২০১৯ সালের অর্থনীতি। অবস্থা যা দৃশ্যমান তাতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ভালো যাওয়ার কথা। এখন ভরা শীতকাল, বাংলা পৌষ এবং ইংরেজি জানুয়ারি মাস। ধান চালের বাজার নিম্নমুখী। কিছুদিন আগেই নতুন ফসল উঠেছে। আমন ফসল ভালো হয়েছে। কৃষকের ঘরে-ঘরে নতুন ধান, নতুন চাল। পিঠা-পুলি, মুড়ি পায়েশের আয়োজন চারদিকে। মাছ-মাংস, শাক-সবজি, তরি-তরকারি ডিম-দুধ, হাঁস পাখির মাংস সবই নাগালের মধ্যে। মূল্যস্ফীতি (ইনফ্লেশন) সর্বনিম্ন পর্যায়ে। নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খুবই সহনশীল বৃদ্ধি। মূল্যস্তর সহনশীল পর্যায়ে। দেশের কোথাও খাদ্যাভাব নেই। শীতও মানুষকে অসহায় করে তোলেনি।

গ্রামবাংলা এখন ‘ক্যাশ’-এ ভরপুর। ‘রেমিটেন্স’ নভেম্বর মাসে ভালো এসেছে। এসেছে এক দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার (বিলিয়ন সমান শত কোটি)। বছর শেষে তা ১৪-১৫ বিলিয়ন ডলার হবে। রেমিটেন্সের টাকা (ক্যাশ), তার সঙ্গে নির্বাচনী ব্যয়, সরকারের ব্যয় এবং প্রার্থীদের ব্যয়। প্রার্থীদের সিংহভাগ ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, মিডিয়ার মালিক, রাজনীতিবিদ কাম-ব্যবসায়ী, ধনাঢ্য অবসরপ্রাপ্ত সরাকরি কর্মকর্তা। তারা হাত খুলে খরচ করেছেন। এর প্রভাব বাজারে আছে। নগদ ঘুরছে হাতে হাতে। মানুষ আনন্দ করেছে। চা-বিস্কুট খেয়েছে। নাস্তা-পরোটা খেয়েছে, লাঞ্চ করেছে। খারাপ হয়নি। এই প্রবণতা আগামী দিনেও থাকবে। এবং আরেকটি লক্ষণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ। মাঝখানে এতে একটু টান পড়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ বছর শেষে দাঁড়িয়েছে ৩২ বিলিয়ন ডলারের ওপর। তাহলে ২০১৯ সালটি শুরু হচ্ছে ভালো রিজার্ভ দিয়ে। এর ওপর যে চাপ শুরু হয়েছিল তা আপাতত শেষ। আমদানি ও রপ্তানিতে বিরাট পার্থক্য ঘটে যাচ্ছিল। আমদানি ছিল বেশি, রপ্তানি কম। আমদানির পরিমাণ বাড়ছিল দুটো কারণে। প্রথমত ব্যবসায়ীদের কারণে, দ্বিতীয় সরকারের কারণে। সরকার তার অবকাঠামোর জন্য আমদানি করছিল। আপাতত ঐ ধাক্কা শেষ। সেজন্য ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্টে’ (বিওপি) যে চাপ তৈরি হয়েছিল, সে চাপ রহিত হয়েছে। তা পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হচ্ছে।

গত জুলাই-অক্টোবর সময়ে আমদানির পরিমাণ বেড়েছিল ৯ শতাংশ। আর জুলাই-নভেম্বর এই পাঁচ মাসে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। এতে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস পেয়েছে। ব্যালেন্স অব পেমেন্ট রাহুমুক্ত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল তা তিরোহিত হয়েছে। এতে ডলারের দামে স্বস্তিও ফিরে এসেছে। ২০১৮ সালের শেষ দিকে ডলারের দাম স্থিতিশীল হয়। ডলারের ওপর চাপ বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। ২০১৯ সালের দিকে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে আমার ধারণা। এই ধারণা করার কারণ আছে। আন্তর্জাতিক সকল খবরেই দেখা যাচ্ছে ঐ বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা নেই। মাঝখানে একটা ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। প্রতিবেশী ভারতে খুব বড় প্রভাব পড়েছিল। তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং তা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে— এই আশঙ্কায় ভারতে ডলারের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। ভীষণ চাপে পড়ে ভারতের অর্থনীতি। আমাদেরও বাজেট ঘাটতির পরিমাণ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। আশার কথা তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি রোধ হয়েছে। তেল উত্পাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে এসেছে। তেলের দামও বেশ হ্রাস পেয়েছে। এটা যে কত বড় স্বস্তির ঘটনা হবে ২০১৯ সালে তা যারা বাজেট করেন তারাই জানেন। বস্তুত তেলের মূল্যের নিম্নগতি এবং স্থিতিশীলতা আমাদেরকে স্বস্তি দিয়ে যাচ্ছে অনেক দিন যাবত্। আবার অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মূল্যও স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে। অনেক ভোগ্যপণ্যের দামও স্থিতিশীল। ভারতে এই মুহূর্তে পেঁয়াজের দাম খুবই নিচুতে। তাদের এতে অসুবিধা হলেও আমাদের তাতে লাভ। আমরা পেঁয়াজ আমদানি করি। ভারতের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রচুর (হিউজ)।

ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটায় আমরা একই ডলারের বেশি ভারতীয় পণ্য আমদানি করতে পারব ২০১৯ সালে। এটাও স্বস্তির বিষয়। একই ঘটনা ঘটবে চীনাদের সঙ্গে । বাণিজ্য করার সময়ে। সেখানেও স্বস্তি মিলবে আমার ধারণা। এদিকে ঋণ সরবরাহ বৃদ্ধিতে একটা সংশোধনমূলক প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। বিগত দিনে অনেকের মতে প্রয়োজনীয় ঋণ বৃদ্ধি ঘটেছে। এতে ব্যাংকগুলোর সমস্যা বৃদ্ধি পায়। আমানতের প্রবৃদ্ধি কম হচ্ছিল অথচ ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি হচ্ছিল। এতে তারল্য সংকট দেখা দেয়। অনেক ব্যাংক এই সংকট মোকাবিলায় হিমসিম খাচ্ছিল। সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য স্ট্যাটুটরি লিক্যুইডিটি রেশিও পরিবর্তন করতে হয়। সরকারের আমানত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ছাড় দিতে হয়। এর ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এদিকে ঋণ সরবরাহ বৃদ্ধিতে কিছুটা ভাটা পড়ে। এটা খারাপ লক্ষণ নয়। ব্যাংকগুলো একটু দম ধরার সময় পেয়েছে। এর ফলে ২০১৯ সালে তাদের পক্ষে হাল ধরা সম্ভব হবে। নতুন বিনিয়োগে তারা প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করতে পারবে।

২০১৮ সালে দেশীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এতটা আশাপ্রদ ঘটনা ঘটেনি। অনেকেই বলেন, এরজন্য দায়ী নির্বাচন। ২০১৮ ছিল নির্বাচনী বছর। বিনিয়োগকারীদের অনেকেই ‘ওয়েট এ্যান্ড সি’ নীতি অনুসরণ করে। তবু তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালের তুলনায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে ১৩টি নতুন কোম্পানি ২০১৮ সালে ৫৪০ কোটি টাকা আইপিও’র মাধ্যমে বাজার থেকে উত্তোলন করে। অথচ ২০১৭ সালে পুঁজি উত্তোলনের পরিমাণ ছিল প্রায় অর্ধেক। এই মন্দার বাজারে এটা অবশ্যই ছিল ভালো খবর। আমার ধারণা, নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর পরিস্থিতি, বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক জোনগুলোর কয়েকটি কার্যোপযোগী হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সমস্যা ছিল— তেল, গ্যাস, বিদ্যুত্ এবং জমি। জমি পাওয়াই যাচ্ছিল না। পেলে দাম তার অনেক বেশি। জমির সমস্যা অনেকাংশে অর্থনৈতিক অঞ্চল— বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে সমাধান হবে বলে আশা করা যায়। বিদ্যুত্ উত্পাদনও বেশ বেড়েছে। এখন শিল্প উদ্যোক্তারা বিদ্যুত্ আগের চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছেন। তবে সমস্যা থেকে যাচ্ছে ঋণের ওপর সুদ— যা এখনো বেশি। সরকারের ৯-৬ নীতি এখনও ব্যাংকগুলো সর্বাংশে কার্যকর করতে পারেনি। এর কিছু সমস্যাও বিদ্যমান। আমানতকে (ডিপোজিট) বেশি সস্তা করলে সঞ্চয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জনগণকে সঞ্চয়ে নিরুত্সাহিত না করে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কঠিন কাজ। তবে এর কোনো বিকল্প নেই।

২০১৯ সাল আবার নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসবে। প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংকিং খাত। এই খাতে দিনদিন খেলাপি ঋণ বাড়ছে। আগে শুধু শিল্পে ঋণখেলাপি হতো, এখন সকল ব্যবসাতেই হচ্ছে। বড় বড় অনেক ব্যবসায়ী, বিশেষ করে চট্টগ্রামের বড় বড় ব্যবসায়ীদের অনেকেই ঋণখেলাপি হচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলাও হচ্ছে। এদিকে ঋণ পুনঃকাঠামো করা বড় বড় ব্যবসায়ীরাও খেলাপি হওয়ার পথে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বড় একটা ব্যবসায়ী গ্রুপ সরকারকে বলেছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে। সমস্যাটা গভীর। এদিকে নতুন সরকারকে নজর দিতে হবে। খেলাপি ঋণ, পুঁজি স্বল্পতা, আর্থিক শৃঙ্খলা ইত্যাদি হবে মুখ্য বিবেচ্য বিষয়। রাজস্ব আহরণে শ্লথগতি দেখা দিয়েছে। এটা কি অতিরিক্ত ‘টার্গেট’ করার কারণে, না ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দার কারণে তা খতিয়ে দেখতে হবে। তা না হলে রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সম্ভবত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেটকে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। নির্বাচনের কারণে পর্যটন ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি একটা উদাহরণ দিলাম। এমন আরো কিছু ব্যবসা আছে। এসব দিকে ২০১৯ সালে নতুনভাবে নজর দিতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় বিনিয়োগ। এর জন্য প্রথম থেকেই উঠেপড়ে লাগতে হবে।

n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার। সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়