ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ
একদিকে দীর্ঘ তিন মাসের অধিক সময় আন্তর্জাতিক দিকনির্দেশনায় ও যৌক্তিক কারণে ইমার্জেন্সি অবস্থার বাইরে সাধারণ রোগী না দেখা, অন্যদিকে বিনা মূল্যে টেলিমেডিসিন সেবা দিয়ে ডেন্টাল চিকিত্সকদের একটি বড় অংশ অনেকটা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গবেষণায় স্পস্ট যে, করোনা মহামারিকালে অন্যান্য পেশার মধ্যে ডেন্টাল চিকিত্সা অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ করোনা ভাইরাস শরীরের ওপরের শ্বাসতন্ত্রে থাকতে স্বছন্দ বোধ করে, ফলে মুখের মধ্যে এদের অবাধ বিচরণ। ডেন্টাল চিকিত্সায় প্রয়োজনীয় শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চিকিত্সা প্রদান অসম্ভব, তাই সামান্য অসাবধানতায় চিকিত্সক, রোগী বা ডেন্টাল চেম্বারে উপস্থিত যে কারো মধ্যে এই ভয়াবহ ছোঁয়াচে ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে, আর তাই ভাইরাসের ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে ডেন্টাল চিকিত্সকরা রোগীদেরকে ঘরে থেকে প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা দিয়ে আসছে।
যদিও সংক্রমণ প্রতিরোধে বেশকিছু গাইডলাইন আসছে; কিন্তু শতভাগ নিশ্চয়তা কোনো কিছুতেই নেই। এর ওপর বেশির ভাগ চিকিত্সা পদ্ধতিতে উচ্চ শক্তিতে বাতাস ও পানির প্রয়োজন পড়ে যেখান থেকে ভাইরাস সংবলিত ড্রপলেট ও অ্যারোসল তৈরি হয় যা বাতাসের মধ্যে উচ্চ গতিতে থাকতে পারে। অনেকটা নিশ্চিত ঝুঁকি নিয়ে অগণিত রোগীর ইমার্জেন্সিসেবা দিতে গিয়ে প্রায় শতাধিক ডেন্টাল চিকিত্সক কোভিডে আক্রান্ত হয়েছে বা উপসর্গ নিয়ে আছে। চিকিত্সকদের করোনা মৃত্যুর মিছিলেও আছে ডেন্টাল চিকিত্সক। কোনোভাবেই বলার অবকাশ রাখে না যে, মেডিক্যাল চিকিত্সকের পাশাপাশি ডেন্টাল চিকিত্সকরাও বিভিন্ন চিকিত্সাকেন্দ্রে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কোভিড মোকাবিলায় সাহসের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
সাধারণ মানুষ বিশেষ করে প্রান্তিক জনগষ্ঠীর কাছে আধুনিক চিকিত্সাব্যবস্থা ছিল অনেকটা অকল্পনীয়। দাঁতের ব্যথা শরীরের অন্যান্য ব্যথার চেয়ে তীব্র, ডেন্টালের কষ্ট নিয়ে রোগীদের কোয়াক নামক এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছাড়া হাতুড়ে ভুয়া চিকিত্সকদের শরণাপন্ন হয়ে অপচিকিত্সার শিকার হতে হতো। শুনতে অবাক লাগলেও ২০০০ সালের আগে দেশে অনুমোদিত ডেন্টাল চিকিত্সকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজারের মতো। দেশ জুড়ে অগণিত মানুষের অসহনীয় ডেন্টাল কষ্ট ও অপচিকিত্সা রোধে সময়ের প্রয়োজনেই অবস্থার পরিবর্তন শুরু হতে লাগল। ডেন্টাল চিকিত্সকরা নিজেদের সংখ্যায় ও গুণমান উন্নয়নে দেশে ও বিদেশে উচ্চ প্রশিক্ষণ, উন্নত বিশ্বে উদ্ভাবিত সব ধরনের চিকিত্সাসহায়ক যন্ত্রপাতির সঙ্গে দ্রুত নিজেদের অভ্যস্তকরণ ও নানা বাস্তবমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন এনে দেশের জনগণের মুখের স্বাস্থ্যসেবায় আপসহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফলাফল হিসাবে বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার বৈধ চিকিত্সকের নিরলস পরিশ্রমে দেশের ডেন্টাল চিকিত্সাব্যবস্থা এখন উন্নত বিশ্বের সমমানের।
বর্তমান অবস্থায় চিকিত্সার নানা বিভাগের মধ্যে বোধ করি ডেন্টাল চিকিত্সায় রোগীরা নির্ভরযোগ্য চিকিত্সা পেতে দেশের চিকিত্সকদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন আর বিলাসিতা ছাড়া কেউই ডেন্টালের অন্তর্ভুক্ত কোনো রোগ নিয়ে দেশের বাইরের কোনো চিকিত্সাকেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে না। বিষয়টির স্বচ্ছতা মেলে যখন দেখা যায় প্রবাসীরাও কেবল এই দাঁতের চিকিত্সার জন্য অপেক্ষা করে দেশে এসে চিকিত্সা নেয়, এমনকি ভিনদেশি রোগীদেরও আস্থার বিষয়টি এখন স্পষ্ট হচ্ছে।
চিকিত্সাসেবার মানকে আস্থার জায়গাতে ধরে রাখতে চিকিত্সকদের প্রতিনিয়ত আপডেট থাকতে হয়, ফলে
বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে দীর্ঘদিন ডেন্টাল ক্লিনিকগুলোতে রোগীর নিরাপত্তায় শুধু ইমার্জেন্সি রোগী দেখায় অনেক ডেন্টাল চিকিত্সক বিশেষ করে নবীন চিকিত্সকরা মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয়ের শঙ্কাতে আছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে স্বল্প সময়ে গড়ে ওঠা আকাশচুম্বী চিকিত্সা সাফল্যের বর্তমান অবস্থা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। চিকিত্সাব্যবস্থায় অতি জরুরি ডেন্টাল বিভাগের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটিসহ অন্যান্য ডেন্টাল অঙ্গসংগঠন। যেমন—বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ডেন্টাল সাইন্স। এই মুহূর্তে প্রাইভেট ডেন্টাল চিকিত্সকদের জন্য সময়োপযোগী প্রণোদনা ও বাস্তবমুখী প্রদক্ষেপ না এলে তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে দেশের অগণিত ডেন্টাল রোগীদের মধ্যে। সম্প্রতি সরকার কর্তৃক চিকিত্সকসহ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়টি বাস্তবায়ন হলেও সেখানে ডেন্টাল চিকিত্সকরা সুযোগ পাননি। মুখ গহ্বর নিশ্চয় শরীরের বাইরের অংশ নয়, বরঞ্চ হিসাবে ডেন্টাল রোগে ভোগে অধিকাংশ মানুষ। উপজেলা পর্যায়ে মাত্র এক জন সরকারি ডেন্টাল চিকিত্সক কর্মরত।
ডেন্টাল চিকিত্সকদের মনোবলসহ আন্তর্জাতিক মানের চিকিত্সাপদ্ধতির চলমান ধারা অটুট রাখতে বিষয়টিকে অন্যতম গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা না করলে দেশের জনগণ হয়তো ভালো চিকিত্সার নিশ্চয়তা থেকে পিছিয়ে পড়বে, আবার সেই কোয়াকনির্ভর অপচিকিত্সার দুর্ভোগসহ বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর মতো অপূরণীয় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। আমাদের সবার প্রচেষ্টায় অক্ষুণ্ন থাক দেশের ডেন্টাল চিকিত্সাব্যবস্থা।
n লেখক :ডেন্টাল চিকিত্সক, সদস্য সচিব, বিএফডিএস
