চীন-ভারত সীমান্তসংঘাত ও করোনাকালীন নির্মমতা

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২০, ২২:১৭

দেবশ্রী বসু মুক্তি

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারত-চীন সীমান্তসংকট করোনাকালীন এক নির্মম ঘটনা! করোনার নীল দংশনে সারা বিশ্ব যখন অকূল পাথারে, এমনই এক প্রেক্ষাপটে ভারত-চীন যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে। এটা কি তবে করোনার উত্পত্তিস্থল নিয়ে বিশ্বের দৃষ্টি সরানোর এক চিরাচরিত কৌশল অবলম্বন, নাকি অন্য কিছু? পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের তার সীমান্তবর্তী দেশ বা দেশসমূহের সঙ্গে রয়েছে সহজাত এক সীমান্ত বিরোধ, ধারাপরম্পরায় এটা যেন নিত্যনৈমিত্তিক। করোনাকালীন এই মহাসংকটে যেখানে সব দেশের উচিত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই মহামারিকে পরাস্ত করা, সেখানে চীন-ভারত সীমান্তসংঘাত ও করোনার উত্পত্তি নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে মত্ত।

ঐতিহাসিকভাবে চীন-ভারত সীমান্ত সমস্যার শুরু হয় সেদিন, যেদিন চীন কর্তৃক ভারতের বর্তমান অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চীনের অন্তর্ভুক্ত এলাকা বলে দাবি করেছিল এবং তা শেষ পর্যন্ত একটা যুদ্ধের সূচনা করেছিল। ১৯৬২ সালে চীন-ভারতের বড় রকমের যুদ্ধের পর, দুই দেশ আর কোনো বড় সংঘাতে না জড়ালেও সীমান্ত নিয়ে শীতল লড়াই প্রতিনিয়তই চলেছে। সর্বশেষ ১৫ জুন লাদাখের গালওয়ান উপত্যকা সীমান্তে ঘটে চীন-ভারত সৈন্যদের মধ্যে সংঘাত। বর্তমানে চীন এবং ভারতের মধ্য বৈরিতার একটা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। এর সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের যুদ্ধংদেহি ও আগ্রাসি মানসিকতা যুক্ত হয়েছে। কারণ তিনি চীনা ‘হান’ উপজাতির অন্তর্ভুক্ত আর সহজাতভাবে হানরা বেশি যুদ্ধংদেহি ও আগ্রাসি প্রকৃতির হয়ে থাকে। ভারতের দাবি, চীনারা সালামি স্লাইসিং কৌশলের মাধ্যমে একটু একটু করে ভারতের ভূমি দখল করে নিচ্ছে। অন্যদিকে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীন-মার্কিন সম্পর্কও বেশ বৈরী। অপরদিকে, ১৯৯৯-২০০০ সাল থেকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়েছে এবং হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে ভারত-মার্কিন সামরিক সহযোগিতায় ফুঁসিয়ে উঠছে চীন। যার বহিঃপ্রকাশ হয় তো বর্তমানের সীমান্ত বিরোধ। 

২০১৯ সালের শেষদিকে চীনের উহান প্রদেশে প্রাদুর্ভাব ঘটে মহামারি করোনার। এরপর থেকে সারা বিশ্বের দোষারোপের দৃষ্টি চীনের ওপর। অন্যদিকে, ভারতেও এখন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কোভিড-১৯ দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছে। তাই কারোনাকালীন দৃষ্টি সরাতে এ দুই দেশের সীমান্তসংঘাত কি তাদের অভ্যন্তরীণ নীতির অন্তর্ভুক্ত? তবে এ সংঘাত থেকে যদি কোনো যুদ্ধের প্রেক্ষাপট রচিত হয়, তবে তা হবে জোটভিত্তিক যুদ্ধ, যা করোনাকালীন নাজুক অর্থনীতিকে আরো বেসামাল করে দেবে। আর এতে সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো। 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটা কথার প্রচলন আছে তা হচ্ছে, ‘স্থায়ী শত্রু বা বন্ধু বলে কিছু নেই’। বেশি দূরের কথা নয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় চীনের অবস্থান মোটেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে ছিল না, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুপ্রতীম ও তাদের সম্পর্ক বেশ উষ্ণ। ইতিহাস ঘাটলে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে কার্যকর ফল মিলতে পারে যদি চীন ও ভারত দ্বি-পাক্ষীকভাবে ব্যাপক কূটনৈতিক তত্পরতা চালিয়ে তাদের সীমান্ত সমস্যার সুরাহা করে। মোদ্দাকথা, করোনাকালে বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই অর্থনীতিই ভঙ্গুর, তাই এ সময়টায় কোনো রকম সংঘাতে না জড়িয়ে, নিজেদের অর্থনীতির জন্য সুযোগ খোঁজা এবং বিশ্বব্যাপী করোনা মোকাবিলাই হোক বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপট।

n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ