তাবিন এবার নার্সারি শেষ করে ওয়ানে উঠেছে। খুব হাসিখুশি আর মায়াবী ছেলে। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে গল্প শোনে। আবার ওর খালামণির কাছে যেসব গল্প শুনে, ওগুলোও বাবাকে শোনায়। বড়ো ভাইকে রেখে কিছুই খেতে চায় না।
: ভাইয়া, এটা তোমার কলা। ও তাফিমকে বলে।
: আমি এখন কলা খাব না।
তাফিমের জবাবে বলে,
: আমি তো খাব? তুমি খাবে না কেন?
তাফিম তাবিনের বড়ো ভাই। তাফিম এবার ক্লাস টুতে। ওর বুদ্ধির সীমা নেই। তাবিনের আরো বেশি বুদ্ধি। তাবিনের যেমন দয়ালু মন, তেমন বুদ্ধি। তাই ওর খালামণি ওকে কখনো ‘দয়ালবাবা’, কখনো ‘বিজ্ঞানী সাহেব’ ডাকেন।
তাফিম ও তাবিন ঈদ করতে মা-বাবার সাথে শেরপুর এসেছে। শেরপুর শহরের কাছেই নানার বাড়ি। শহর থেকে একটু দূরের গ্রামে দাদার বাড়ি। ওরা ঈদের আগের দিন সকালে নানার বাড়িতে এসে জিরিয়ে নেয়। বিকেলে নিজেদের গাড়িতেই দাদুবাড়ি চলে যায়। ঈদের তৃতীয় দিন দাদুর বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে নানুর বাড়িতে আসে। আরো দুইদিন নানার বাড়িতে থেকে ঢাকায় ফিরে যায়।
তবে ঈদের দিন ভোরে ওর বাবা শ্বশুর-শাশুড়িকে সালাম জানাতে আসেন। তখন বাবার সাথে ওরাও নানার বাড়িতে আসে। দুই ঘণ্টার মতো থাকে। এগারোটার দিকে বাবার সাথে আবার দাদার বাড়ি চলে যায়।
এবার ঈদের আগের দিন তাবিন দাদার বাড়িতে যায়নি। খালামণিকে ছেড়ে যেতে মন চায়নি। মা আপত্তি করলে বলেছে,
: আমাকে বাবা কাল এসে নিয়ে যাবে।
এটা ওর খালামণিই শিখিয়ে দিয়েছে। না দিয়ে উপায় কী? ওর যে খালামণির সাথে অনেক গল্প আছে।
বিকেলে নানুর কিনে রাখা পটি-কার চালায়। বারান্দায় ওটা চালিয়ে খুব মজা পায়। এবার ওটা চালাতে গিয়ে ওর জুতোর আলমিরাতে চোখ পড়ল। ওটার দরজাটা খোলা ছিল। তখন ও একটা বিষয় খেয়াল করেছে। তবে ড্রাইভিং রেখে তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি।
সন্ধ্যায় খালামণির কাছে গল্প শুনেছে। দোয়েল, টুনটুনি আর ব্যাঙের গল্প। গল্প শুনেই হঠাত্ ওর দয়ালু মনে ভীষণ চিন্তা বেড়ে গেল!
: নানুভাই, ঠিকমতো খাচ্ছ না কেন?
নানি বললেন।
: নানু, রাতে না খেলে কী হয়? ও জবাবে বলল।
: রাতে না খেলে কঠিন অসুখ হয়, নানাভাই।
নানির একথা শুনে ওর চিন্তা আরো বেড়ে গেল। ঠিকমতো খেতেই পারল না। মনে মনে একটাই চিন্তা, বেচারার কঠিন অসুখ হবে।
খালামণিকে ফাঁকি দিয়ে একটু পরপর জুতোর আলমিরার কাছে চলে যায়। ওটা যে এখন বন্ধ! দরজায় তালা এঁটে দেওয়া হয়েছে।
খালামণির গল্পে আজ ওর মনোযোগ নেই। ওর নিজেরও কোনো গল্প নেই। তবে খালামণিকে জিজ্ঞেস করে,
: খালামণি, ধরো একটা বাক্সে কেউ ঢুকলো, আবার ওটা আলমিরায় রেখে তালা লাগিয়ে দিলে তখন ওটা কি মারা যাবে?
খালামণি ওর কথার আগাগোড়া কিছুই বোঝে না।
রাত দশটা বেজে গেল। তবুও তাবিনের চোখে ঘুম নেই। এমন সময় নানাভাই এলেন। তিনি ওর নানিকে বললেন,
: জুতোর আলমিরার চাবিটা দাও। একথা শুনে সে সাথে সাথে বিছানা থেকে নেমে এল।
নানাভাই আলমিরা খুলে তার পছন্দের জুতোতে নতুন পালিশ লাগাবেন। তাবিন ওর নানার পাশেই। ও সবকিছুই গভীর মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করছে। নানা এবার আলমিরা খুললেন। তাবিন কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। এরপর নানাভাই একটা বাক্স বের করলেন। ওটা যে সেই বাক্সটাই! ওটা খুলতেই থপাস করে ওর সেই প্রাণীটা লাফ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
: নানাভাই, তোমাকে ধন্যবাদ। খুব ভালো একটা কাজ করলে।
ওর নানা যেন আকাশ থেকে পড়লেন! তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না। তাই এবার প্রশ্ন করলেন,
: কী ভালো কাজ করলাম, নানাভাই?
ও জবাবে বলল,
: নানাভাই, তুমি যদি বাক্সটা না বের করতে, তাহলে রাতে কুনোব্যাঙটা না খেয়ে থাকত। ওটা অসুস্থ ও দম বন্ধ হয়ে মারা যেত।
এবার খালামণি, নানি ও নানা সবাই হেসে ফেললেন। ওর অস্থিরতার সমস্ত কারণ খালামণি বুঝে ফেলল। খালামণি বলল,
: এজন্যই তো বলি, আমার দয়ালু বাপজান।
