তোমরা যারা ‘মাইরি’ বলো!

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২০, ২১:২৩

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্তমানে একটি শব্দের প্রাদুর্ভাব বেশ লক্ষণীয়। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান তথা জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সবাই এই শব্দটি ব্যাপক হারে ব্যবহার করেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের সমাজে পাক্কা ধার্মিক বলে পরিচিত কিছু লোককেও ‘মাইরি’ নামক এই শব্দটি ব্যবহার করতে প্রায়শ দেখা যায়। আমি নিশ্চিত যে, তারা যদি এই ইমান বিরোধী শব্দটির অর্থ জানতেন তাহলে কস্মিনকালেও তারা এই শব্দটি ব্যবহার করতেন না।

মাইরি শব্দের অর্থ কী?

মাইরি শব্দটি পর্তুগিজ ভাষা থেকে আগত একটি শব্দ। যেটি শপথ, কসম বা দিব্যি বুঝাতে ব্যবহূত হয়। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে যিশুর  মা মেরির নামে শপথ/কসম/দিব্যি করা। আমরা জানি, খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করে। তাই এই ধর্মে ইসা (আ)-এর মাতা মারইয়াম অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হন। তাদের কেউ কেউ মারইয়ামকে আল্লাহর স্ত্রী বলেও মনে করে (নাউজুবিল্লাহ)। মুসলমানরা নিজের কথার দৃঢ়তা বুঝাতে শপথ করার সময় যেমন ‘ওয়াল্লাহি’ বা ‘আল্লাহর শপথ বা কসম’—শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন। ঠিক তেমনিভাবে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও তাদের কথার দৃঢ়তা বুঝাতে ‘মাইরি’ বা ‘মাতা মেরির শপথ’—শব্দসমষ্টি  ব্যবহার করেন। তবে বর্তমানে কেউ কেউ নিজের মায়ের নামে কসম করতেও ‘মাইরি’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন।

ইসলাম কী বলে?

মহান আল্লাহতায়ালাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো নামে শপথ করা ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং মারাত্মক অপরাধ। আমাদের সমাজে অজ্ঞ লোকেরা বিভিন্ন সৃষ্টির নামে শপথ করে থাকে। যেমন: নবীর কসম, ফেরেশতাদের কসম, মা-বাবার কসম, ছেলেমেয়ের কসম, ভালোবাসার কসম, জীবন, প্রাণ, মাথাসহ পীর ও মাজারের নামেও এ সমাজে কিছু লোককে কসম করতে দেখা যায়। এ ছাড়া অঞ্চলভেদে শপথের এমন কিছু বাক্যও শোনা যায়।  যেমন:‘আমি যদি এমনটি করে থাকি তবে আমি আমার কোলের শিশু বাচ্চাটির মাথা খাই’,  ‘আমার মরা বাপের কসম’, ‘আমার মরা মায়ের কসম’ ‘মাটির ওপর দাঁড়িয়ে বলছি’ অথবা ‘মরা কাঠটায় বসে বলছি’ ইত্যাদি। হাল-জমানায় কিছু শিক্ষিত যুবককে কথায় কথায় বলতে শোনা যায়, ‘মাইরি এ কাজ আমি জীবনেও করিনি’ অথবা ‘মাইরি এ কথা আমি জীবনেও বলিনি’ ইত্যাদি। ইসলামের দৃষ্টিতে উপরোক্ত শব্দ বা বাক্যসমূহ দিয়ে শপথ করা সুস্পষ্টভাবে হারাম।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত—রাসূল (স) বলেন, ‘সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের পিতৃপুরুষের নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। কারো যদি শপথ করতেই হয়, তবে সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে অথবা চুপ থাকে।’ [সহিহ বুখারি ও মুসলিম] আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা)  থেকে বর্ণিত অপর হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে শপথ  করল, সে শিরক করল।’ [ আবু দাউদ ও তিরমিযি] অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমানতের (আনুগত্য, ইবাদত, সম্পদ, গচ্ছিত দ্রব্য ইত্যাদি) নামে কসম করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’  [ আবু দাউদ]

মাইরি বলছেন, কী করবেন?

হাদিসে এসেছে কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করে তবে তাকে কাফফারা আদায় করতে হবে। আমরা যারা অজ্ঞতাবশত এতদিন মাইরি বলেছি তাদেরকেও কাফফারা আদায় করতে হবে।  ভাবছেন একজন দাসকে মুক্ত করতে হবে অথবা একটানা ষাট দিন রোজা রাখতে হবে? না। মোটেই নয়। গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করার কাফফারা ঠিক ওরকম নয়। রাসূল (স) বলেন, ‘যে ব্যক্তি শপথ করতে গিয়ে লাত ও উজ্জার নামে শপথ করে বসে, সে যেন বলে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’ [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]

অর্থাত্ কেউ যখন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করে তখন সে ইসলাম থেকে বিতাড়িত হয়ে যায়। তাকে পুনরায় কালেমা পড়ে ইসলামে ফিরে আসতে হয়। কী ভয়ংকর ব্যাপার! সুতরাং আধুনিক জাহেলিয়াতের এই যুগে নিত্যনতুন শব্দ শুনে ভালোভাবে অর্থ না জেনে গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেওয়া আদৌ উচিত নয়। আমাদের অজানা এই শব্দগুলো হতে পারে ইমান ও ইসলামবিরোধী। তাই ইমান ও ইসলাম বাঁচানোর তাগিদে নতুন শোনা বা দেখা শব্দগুলোর অর্থ সঠিকভাবে জেনে, বুঝে ও অনুধাবন করে তা সচেতনভাবে ব্যবহার করতে হবে। নতুবা নিজের অজান্তেই ইমানহারা হয়ে মারা গেলেও হয়তোবা বুঝবার অবকাশটুকুও পাওয়া যাবে না।

lলেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক