সারা বিশ্বে করোনা মহামারি লইয়া মানুষ চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে রহিয়াছে। ইহার শেষ কোথায় তাহা কেহ জানে না। ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অনেকে আশঙ্কা করিতেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসিতেছে। ইহা হইবে আরো মারাত্মক। এখন প্রতিদিন গড়ে ১ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হইতেছেন। এই অবস্থা চলিতে থাকিলে এই ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা ১ কোটি ছাড়াইয়া যাইতে আর বেশি দিন লাগিবে না। এমতাবস্থায় সবাই এখন চাহিয়া আছেন করোনার ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কারের দিকে। এই মুহূর্তে বিশ্বের শতাধিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে। ইহার মধ্যে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন আগাইয়া আছে বলিয়া জানা গিয়াছিল; কিন্তু সকলকে ছাড়াইয়া প্রথমবারের মতো ভ্যাকসিন তৈরিতে সফল হইয়াছে বলিয়া দাবি করিয়াছে করোনার উত্পত্তিস্থল চীন।
জানা যায়, চীনের সামরিক বাহিনীর গবেষণা শাখা একাডেমি অব মিলিটারি সাইন্স এবং স্যানসিনো বায়োলজিকসের তৈরি এই ভ্যাকসিনটির নাম এডি৫-এনকোভ। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হওয়ার পর ইহা শুধু সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য অনুমোদন দেওয়া হইয়াছে এবং তাহাদের মধ্যে এক বত্সরের জন্য প্রয়োগ করা হইবে। শুধু ইহাই নহে, চীনের তৈরি আটটি ভ্যাকসিন দেশে-বিদেশে মানবদেহে পরীক্ষার অনুমোদন পাইয়াছে। এডি৫-এনকোভ কানাডায় মানবদেহে পরীক্ষার অনুমতি পাইয়াছে। চীনের একটি ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হইবে বাংলাদেশেও। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ গ্লোব বায়োটিক সকল পর্যায় অতিক্রম করিতে পারিলে আগামী ছয় হইতে সাত মাসের মধ্যে একটি টিকা বাজারে আনিতে পারিবে বলিয়া আশাবাদ ব্যক্ত করিয়াছে। এই ব্যাপারে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে এই সকল ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা লইয়াও অনেকে প্রশ্ন তুলিতেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউচির মতে, করোনার বিরুদ্ধে পরিপূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। ইহার ভ্যাকসিন হয়তো ৭০ হইতে ৭৫ শতাংশের বেশি কার্যকর হইবে না। এমনকি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির তৈরি যে ভ্যাকসিন লইয়া বিশেষজ্ঞরা খুবই আশাবাদী, সে ব্যাপারেও যুক্তরাজ্যের ভ্যাকসিন টাস্কফোর্সের প্রধান কেট বিংহ্যাম বলিয়াছেন, ইহা উপসর্গ উপশম করিতে সাহায্য করিলেও ইহার মাধ্যমে পুরাপুরি নিরাময় লাভ করা সম্ভব নাও হইতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় ভ্যাকসিন আবিষ্কারের এই যে প্রচেষ্টা চলিতেছে তাহা আশাব্যঞ্জক। এই বত্সরের মার্চের মাঝামাঝিতে যুক্তরাষ্ট্রেই মানবদেহে প্রথম করোনা ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শুরু হয়। তবে এখনো তাহারা সফল হন নাই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ইহার জন্য আরো ১২-১৮ মাস লাগিতে পারে; কিন্তু করোনা যেইভাবে সারা বিশ্বকে কাঁপাইয়া তুলিয়াছে, তাহাতে সময়টা অনেক দূরের বলিয়াই মনে হইতে পারে। আমরা মনে করি, যেই দেশই করোনার টিকা আবিষ্কার করুক না কেন, মানবতার বিবেচনায় তাহা সাধারণ বৈশ্বিক পণ্য হিসাবে সকলের জন্য উন্মুক্ত করিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। প্রয়োজনে তাহা বিতরণ করিতে হইবে বিনা মূল্যে। আর করোনার ভ্যাকসিন বাজারে না আসা পর্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা ও স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলাই যে একমাত্র দাওয়াই তাহা বুঝিতে আমাদের অসুবিধা হওয়ার কথা নহে।
