কথা দিয়েও তুমি আর ফিরলে না। চলে গেলে সবাইকে কাঁদিয়ে—কোথায় কত দূরে চলে গেলে জানি না। শুধু জানি তুমি আর কোনো দিন ফিরবে না। তোমার এই চলে যাওয়া কিছুতেই মন মানছে না।
দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার একমাত্র নারী ফটোসাংবাদিক রেহেনা আক্তার, তারুণ্যে ভরা হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল লড়াকু ছোটখাটো একটি মেয়ে। ওর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে কুমুদিনী কমপ্লেক্সে। দৈনিক ইত্তেফাক ও পাক্ষিক অনন্যার সম্পাদক তাসমিমা হোসেন আমাকে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের পরিচালক ভাষাসৈনিক প্রতিভা মুত্সুদ্দির জীবনকথা নিয়ে একটি লেখা তৈরি করতে বললেন ২০১৬ পাক্ষিক অনন্যার ঈদসংখ্যার জন্য। সেই উপলক্ষ্যে রেহেনা এলো প্রতিভা মুত্সুদ্দির ছবি তুলতে। প্রথম আলাপেই একটু চমকে গেলাম। এত ছোট মেয়ে ঢাকা থেকে একাই এসেছে, তাও বলে কিনা ফটোসাংবাদিক! তখন সে পাক্ষিক অনন্যায় কাজ করত।
কাজ শেষে সবকিছু ঘুরে দেখতে দেখতে বলল, আপা আপনি আমাকে যত ছোট ভাবছেন আমি তত ছোট নই। আমার একটা মেয়ে আছে। মেয়েটা যদি আপনাদের এখানে পড়ার সুযোগ পেত... আমার খুব ইচ্ছে ভারতেশ্বরী হোমসে মেয়েটা পড়ে। তাছাড়া আমি তো সারাদিন বাইরে বাইরে থাকি। বাসায় ওকে দেখার তেমন কেউ নেই। কাজে বের হলেই মেয়ের চিন্তায় খুব অস্থির থাকি।
রেহেনার ইচ্ছে পূরণে প্রতিভা মুত্সুদ্দি ও তাসমিমা হোসেন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। ২০১৭ সালে রেহেনার মেয়ে রাদিয়া ইসলাম পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হলো। সেই থেকে ভারতেশ্বরী হোমসের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার সঙ্গেও গড়ে ওঠে এক আত্মিক সম্পর্ক। ঢাকায় কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সে ঠিক হাজির হয়ে যেত। বড় বোনের মতো ভালোবাসত। জানত ভালোবাসা আদায় করে নিতেও। জানাত তার সমস্যার কথা। দেখেছি কোনো বিপদে সে ভেঙে পড়েনি। বরং একটু বেশি শক্ত হয়েই লড়ে গেছে প্রাণপণে। মুখে হাসি লেগে থাকত। দক্ষ হাতে সে সংসারের হাল ধরেছিল আবার সংসারের চাকা সচল রাখতে ক্যামেরাই ছিল তার হাতিয়ার। ঢাকা শহরে বাইকে চেপে ছবির খোঁজে ছুটে বেড়ানো মেয়েটি তার বয়সের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী ছিল। অর্থ, শিক্ষা—কোনো কিছুর জোরে নয়—দক্ষতা, পরিশ্রম আর ভালো ব্যবহারে সে অর্জন করেছিল বহু মানুষের ভালোবাসা।
—কোথায় পাও এত শক্তি?
মিষ্টি করে হেসে বলত, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি দেদার, সেই সাহসে এতদূর আসতে পেরেছি।
রেহেনা ২৮ মার্চ শনিবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসে। আক্রান্ত হয়েছিল কোলন ক্যানসারে। ৭ এপ্রিল অপারেশন হয়েছিল। ফোনে প্রায়ই ম্যাসেজ দিত আমাকে। ৪ জুন লিখল আপা আমার জন্য দোয়া করবেন। শরীর খুব খারাপ। কেমোথেরাপি চলছে। ব্যথা বেড়ে গেছে। সব ঠিকঠাক মতো চললে ভালো হয়ে যাব আপা। শেষ মেসেজ এসেছিল ২৬ জুন। কাজে যোগ দেওয়ার ইচ্ছেটা ছিল প্রবল। দুর্ভাগ্য যে করোনা সব ঠিকঠাক হতে দেয়নি। ২৯ জুন সন্ধ্যায় জীবনের সব লেনদেন মিটিয়ে সে চলে গেল না-ফেরার দেশে। ক্যামেরা হাতে রেহেনার দৌড়ঝাঁপ থেমে গেল।
কত বয়স হবে। ৩০ পেরিয়েছিল হয়তো। এর মধেই সে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছে পাক্ষিক অনন্যায়, বাংলা নিউজ টুয়েন্টিফোর অনলাইনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। এ সময়ে একজন নারী যখন ক্যামেরা হাতে ছুটে বেড়ায় পথেপ্রান্তরে, ছোটে খবরের সন্ধানে, ক্যামেরায় টুকে আনে জনপদের অসঙ্গতির চিত্র, তখন তাকে সাহসী বলতেই হয়। তার বড় ভাই ফজিত শেখ বাবু একজন দক্ষ ফটোসাংবাদিক। তার হাতেই রেহেনার ক্যামেরায় হাতেখড়ি। খুব অল্প বয়সে রেহেনার বিয়ে হয়। দ্বিতীয়বার মা হয়েছিল একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে। পরপর দুই কন্যা সন্তান—আমাদের সমাজ তো এত সহনশীল নয় যে, তা হাসিমুখে মেনে নেবে! রেহেনা সংসারের সেই ঝড় সামলেই কাজ করত। শুধু নিজের সংসারের কথাই ভাবত না; ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনের প্রতিও ছিল সমান খেয়াল। রেহেনার একটাই আকুতি ছিল, আমি পারিনি, আমার মেয়ে যেন পারে লেখাপড়া শিখে অনেক দূর এগিয়ে যেতে। রেহেনা সবসময় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করত তাসমিমা হোসেনের প্রতি—যিনি তাকে এত বড় হাউজে ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন। রেহেনা তার মর্যাদা রেখেছে। অদম্য সাহসে ছুটে বেড়ানো রেহেনা ক্যানসারের কাছে পরাজিত হলেও একটা দৃষ্টান্ত রেখে গেল। রাদিয়া ইসলাম ও রাবাবা ইসলাম দুই কন্যা জানবে তাদের মায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। তারা গর্বিত হবে, অনুপ্রাণিত হবে। ঢাকা শহরে খবরের খোঁজে বাইকে করে ছুটে বেড়ানো জীবনযুদ্ধে ছুটে বেড়ানো পরিশ্রমী মা রেহেনা হবে তাদের আদর্শ। আদর্শ হবে আরো অনেকের কাছে।
রেহেনার হাসিটি মনে পড়বে কারণে অকারণে। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা—রেহেনার আত্মার শান্তি হোক।
n লেখক : শিক্ষক, ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর
