ফরিদপুর-৪ আসনে নৌকা নয়, হেরেছেন জনবিচ্ছিন্ন কাজী জাফরউল্লাহ

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১৯

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ নির্বাচনে হেরেছেন জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে। এ পরাজয়ে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষরা। তাদের দাবি, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা নয়, ব্যক্তি কাজী জাফরউল্লাহর পরাজয় হয়েছে। এই আসনের জনগণ শুধু নৌকার মাঝি পরিবর্তন করে আওয়ামী পরিবারের সন্তান স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরীকে  (নিক্সন) বিজয়ী করেছে।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর—৪ আসনে (ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন) আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী কাজী জাফরউল্লাহকে বিপুল ভোটে হারিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (নিক্সন) ।

ফরিদপুর-৪ আসনটি সব সময়ই আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। এই  আসনটিতে ৩০ বছরেই আওয়ামী লীগ অর্থাত্ ৬টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতেছে। কাজী জাফরউল্লাহ নিজইে এই আসন থেকে ২০০১ সালে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে অযোগ্য হওয়ায় স্ত্রী নিলুফার জাফরউল্লাহ নির্বাচন করলে তিনিও বিজয়ী হন।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, কাজী জাফরউল্লাহ বার বার নির্বাচিত হয়েও এলাকার মানুষের জন্য কোন উন্নয়ন করেননি। রাখেননি এলাকার লোকজনের খোঁজ খবর। এভাবে তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পাশাপাশি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নিকট আত্মীয় ও নেতাদের নানা বিতর্কিত ভূমিকার কারণে নির্বাচনে পরাজিত হন। সে সময় কাজী জাফরউল্লাহর নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নিয়ে কোটিপতি হওয়া এমন অনেক নেতাই এখন আর তার সাথে নেই।

নেতাকর্মীরা জানান, নিক্সন চৌধুরীর রাজনৈতিক দুরদর্শিতার কারণে অনেকেই আওয়ামী লীগ করেও যোগ দিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী নিক্সন চৌধুরীর সাথে। যার ফলে দলে দুটি গ্রুপ হয়ে যায়। এছাড়া ক্ষমতায় থেকে উন্নয়ন করতে না পারায় অনেক নেতাকর্মী এখন আর কাজী জাফর উল্লাহর সাথে নেই। ফলে আবারো পরাজয় হলো কাজী জাফর উল্লাহর— এমনটাই মনে করেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ঘাঁটি ফরিদপুর-৪ এর মানুষ হেভিওয়েট নেতা কাজী জাফরউল্লাহকে প্রত্যাখ্যান করে গ্রহণ করেছে নিক্সন চৌধুরীকে। মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া এলাকার আওয়ামী পরিবারের সন্তান মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম ইলিয়াছ চৌধুরীর ছেলে ও সাবেক হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের ভাই।

চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুল হক মাস্টার বলেন, কাজী জাফর উল্লাহ রাজধানীর অভিজাত এলাকার নেতা। তৃণমূল নেতাকর্মী থেকে তিনি একেবারেই বিচ্ছিন্ন। সাধারণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি কোলাকুলি তো দূরের কথা, হাতটা পর্যন্ত মেলাতে চান না। সেই নেতা কিভাবে নির্বাচনে জয়ী হবেন। অপরদিকে নিক্সন চৌধুরী পাশের জেলা থেকে এসে ব্যাপক উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি ভালো আচরণ করে এই অঞ্চলের মানুষের হূদয়ের মানুষে পরিণত হয়েছেন। তিনি আরো বলেন, জনবিচ্ছিন্নতাই কাজী জাফরউল্লাহর পরাজয়ের কারণ। আর এই পরাজয়ে তার রাজনৈতিক অপমৃত্যু হয়েছে। তার আর এই এলাকায় রাজনীতি না করাই মঙ্গল।

সদরপুর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, নেতাকর্মীদের কোন দাম নেই কাজী জাফরউল্লাহর কাছে। সেখানে নিক্সন চৌধুরী স্বতন্ত্র নির্বাচন করলেও আওয়ামী পরিবারের সন্তান। তিনি দলের কর্মীদের ভালোবাসেন। বিপদে আপদে পাশে থাকেন। এই কারণে এই আসনে কাজী জাফর উল্লাহর পরাজয় হয়েছে। তিনি কোনদিনই আর এই আসনে রাজনীতি করতে পারবেন না। তৃণমূলের কাছে তার সেই গ্রহণযোগ্যতা নেই।

ভাঙ্গা উপজেলা যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া বিশ্বাস বলেন, এই আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এই এলাকার ৮০ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থক। তিনি বলেন, নৌকা মার্কা নয় আমরা শুধু মাঝি পরিবর্তন করেছি। নিক্সন চৌধুরী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর রক্ত প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতা। জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রত্যাশা আগামীতে যেন তাকেই মনোনয়ন দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করেন। 

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী বলেন, আমি গত ৫ বছরে এলাকার উন্নয়ন করেছি, তিন উপজেলার মানুষকে ভালোবাসা দিয়েছি, তারা ব্যালটের মাধ্যমে আমাকে মূল্যায়ন করেছে। তিনি বলেন, আমার দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে, আমি বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র, এই এলাকার মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, আমার শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে হলেও আমি এই এলাকার মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাব।