পাটকল বর্তমান ও ভবিষ্যত্

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২০, ২০:৫৮

আলি জামান

 

বিজেএমসির অধীনে থাকা পাটকলগুলোর ২৫ হাজার শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করা হচ্ছে। এই কারখানাগুলো পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ তথা পিপিপির মাধ্যমে পরিচালিত হবে এমনটি শোনা যাচ্ছে। সিদ্ধান্তটা একেবারে মন্দ না। আমাদের সরকারি খাতের ব্যবস্থাপনার ইতিহাস খুব মধুর নয়। যোগ্যতার ঘাটতি তো আছেই—সেই সঙ্গে অপচয়, দুর্নীতি মিলে পাটকলগুলোর এই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। তবে, সবাই যে অযোগ্য আর দুর্নীতিবাজ তা কিন্তু নয়। অনেক কর্মকর্তাকে দেখা গেছে, আন্তরিক ভাবে দক্ষতার সঙ্গে মিল চালানোর চেষ্টা করতে। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তারাও সাফল্যের মুখ দেখতে পারেনি।

পাটকলগুলোর সমস্যা কোথায়? —দেশ স্বাধীন হবার পর তড়িঘড়ি করে কল-কারখানাগুলো জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু এই কারখানাগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল ছিল না। দলীয় লোকদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়। তাছাড়া করপোরেশন তৈরি করে সেখানকার কিছু কর্মকর্তাকেও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধে এরা প্রায় কিছুই জানতো না। ফলে, অতিদ্রুত মিলগুলো মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করে। এর মধ্যে অনেক প্রশাসক আবার ইচ্ছাকৃতভাবে কারখানাগুলোকে লোকসানে ফেলে দেয়। পরে তারা কেরামতি করে কারখানার মালিক বনে যায়। অনেকে পরামর্শ দিয়েছিল যে, পাকিস্তান আমলের ব্যবস্থাপকদের মিল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হোক। তাদের অধীনে থেকে কাজ শিখে দক্ষ জনবল তৈরি হবার পর স্থানীয়দেরকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। কিন্তু তা হয়নি, বরং আগের ব্যবস্থাপকদেরকে অশোভন ভাবে বিদায় নিতে বাধ্য করা হয়। আদমজির মি. কারিমের ইতিহাস অনেকেরই হয়তো জানা আছে। নিগৃহীত হয়ে বিদায় নেওয়ার পরে এই ভদ্রলোককে ভারত সরকার নিয়ে গিয়ে তাদের পাটকলগুলো পরিচালনার নীতি-নির্ধারক হিসাবে দায়িত্ব দেয়। মিলগুলোর মেশিনপত্র এত পুরানো আর ঝরঝরে হয়ে গেছে যে, এগুলো দিয়ে আর লাভজনক ভাবে উত্পাদন সম্ভব হচ্ছে না। এই কারখানাগুলোকে আধুনিকায়নের প্রস্তাব কোনো সরকারই গ্রহণ করেনি।

কাঁচা পাট কেনা থেকে শুরু করে, স্টোর পারচেজ আর উত্পাদিত পণ্য বিক্রি—সবখানেই অনিয়ম পরিলক্ষিত হলেও এর সমাধানে কখনোই তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো, সব সরকারের আমলেই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আবদার রক্ষা করে চলতে হয়েছে ব্যবস্থাপকদের। প্রতিটি কারখানার ব্যবস্থাপকদের হাতে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা তথা—উত্পাদন থেকে বিপণন কার্যক্রম ছেড়ে দেওয়ার কথা বহুবার আলোচিত হুলেও অজ্ঞাতকারণে তা কার্যকর করা যায়নি। এটা করা হলে ব্যবস্থাপকরা জবাবদিহিতার আওতায় আসত। এই অবস্থার মধ্যে এরশাদ সরকারের আমল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত অনেক কল-কারখানা বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। এর জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করে সরকার। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—উন্মুক্ত পদ্ধতিতে টেন্ডার করতে হবে। সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে কারখানা বেচতে হবে। কারখানাগুলোকে কারখানা হিসেবেই পরিচালনা করতে হবে। অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। সকল শ্রমিক-কর্মচারীদেরকে কাজে বহাল রাখতে হবে। একেবারে যদি না পারা যায়, তবে সর্বনিম্ন সংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাই করতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে এর একটিও কাজে আসেনি। কারণ, একদম পানির দামে মুখচেনা লোকদের কাছে কারখানাগুলো বেচে দেওয়া হয়। এর মধ্যে খুব কমসংখ্যক কারখানা-চালানোর চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কারখানার দখল নেওয়ার পর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মেশিনপত্র, দেওয়ালের ইট, টিনের চাল আর সবশেষে কারখানার জমিটাও বেচে দেওয়া হয়। স্বাভাবিক ভাবেই শ্রমিক কর্মচারীদেরকে চাকরি থেকে বিদায় নিতে হয়।

এসব মিল-কারখানা বেচে দেওয়ার পিছনে যে যুক্তি কাজ করেছে, তা হলো—সরকারের পক্ষে পুঞ্জীভূত লোকসানের বোঝা বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকার আর্থিক বিষয়টা বিবেচনার নিলেও অর্থনৈতিক বিষয়টা সবসময় অগ্রাহ্য করে গেছে কিভাবে...? —লোকসানের বিপরীতে মিলগুলো বছরে কত টাকার ভ্যাট-ট্যাক্স দিচ্ছে, তার হিসাব কি বিবেচনায় নেওয়া হয়? এই কারখানাগুলো আর কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারী, কাঁচাপাট উত্পাদক, ফড়িয়া-ব্যবসায়ী, পাট আর স্টোর সরবরাহকারী, সড়ক-রেল পরিবহন, মিলগুলোর সংলগ্ন হাটবাজার,স্কুল-কলেজ, দোকান-ব্যবসাগুলো জিডিপিতে কতটা অবদান রাখছে—তা কখনো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এই মিলগুলো চালু থাকার সুবাদে শ্রমিকদের পরিবারের জীবনমান বৃদ্ধি, আর তাদের ছেলেমেয়েরা যে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছে—তা কি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে?

আর একটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। ১ আগস্ট ১৯৬৯ এ পূর্ব পাকিস্থান আওয়ামী লীগের নীতি ও কর্মসূচি প্রকাশকালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পাট ব্যবসা জাতীয়করণ করিতে হইবে। এর লক্ষ্যে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমূহের মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকিবে না।’ এর আলোকেই স্বাধীনতার পর পাট ব্যবসা ও পাটকলগুলো জাতীয়করণ করা হয়েছিল। তবে, এবারে আর বিক্রি না করে সরকার পাটকলগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা অনেকটা মন্দের ভালো। কিন্তু বুঝতে পারা যাচ্ছে না যে, এখনই এই সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো? —করোনার থাবায় যেখানে মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে—সেখানে এতগুলো মানুষকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্তটি কি যথার্থ হলো, আর গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের টাকাটাই বা আসবে কোথা থেকে।

 লেখক : প্রেসিডেন্ট, এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।