কেলেই ম্যাকএনানি ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের জনসংযোগকারী নারীরা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২০, ২১:৫৩

আনুশে হোসেন

হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান সমর্থক কেলেই ম্যাকএনানি যখন সিএনএনের ধারাভাষ্যকার ছিলেন, তখন একদিন তার সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে ছিলাম। সেটি ২০১৬ সালের ঘটনা। আমরা দুজনই আমন্ত্রিত হয়েছিলাম সিএনএনের নারী ও রাজনীতিবিষয়ক একটি খণ্ডকালীন বিশেষ অনুষ্ঠানে। যদিও তাকে আমি আগে টেলিভিশনে দেখেছি, কিন্তু সামনাসামনি দেখে আমি হতবাক হয়েছিলাম। সেটি ছিল ২০১৬ সালের নির্বাচনের কয়েক মাস আগের ঘটনা, যে নির্বাচনে ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেন। সে সময় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ট্রাম্পের প্রতি তার সমর্থন দেখে এবং ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানিসহ অসংখ্য অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া দেখে আমি চুপসে গিয়েছিলাম।

ম্যাকএনানি সিএনএনের কাজ ছেড়ে দিয়ে ট্রাম্পের জোরালো সমর্থক হয়ে যান এবং ঘটনাক্রমে তিনি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির মুখপাত্রে পরিণত হন। তারপর তিনি বর্তমানে হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে নতুন কাজে যোগ দেন। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে পৌঁছতে তিনি অতি উত্সাহের সঙ্গে প্রেসিডেন্টকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। প্রেসিডেন্টের ব্যাখ্যাতীত কথা ও কাজকর্ম, বিশেষ করে তার যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে মুসলমানদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা শ্বেতাঙ্গ শক্তি নিয়ে টুইট সবকিছুতে দীর্ঘকাল ধরে ম্যাকএনানির সমর্থন দেওয়ার এবং সঠিক বলে ব্যাখ্যা করার অস্বাভাবিক ক্ষমতা দেখে আমি বিচলিত হয়েছি। আমি ধরতে পারিনি যে, ম্যাকএনানির এসব কি ভুল চিন্তা নাকি ট্রাম্পের প্রতি অধিক ভালোবাসা; নাকি তার নিজের ক্যারিয়ার গঠনের অভিনব কৌশল। তিনি যা বলেন তা কি নিজে বিশ্বাস করেন, নাকি কেবল দক্ষ একজন বিক্রেতা? সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক মাস যাবত্ হোয়াইট হাউজের মঞ্চে তাকে প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দেখে অবশেষে আমার ধারণা হয়েছে, ম্যাকএনানি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য যা করছেন সেটা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী শ্বেতাঙ্গ মহিলারা শত শত বছর ধরে যা করেছেন, তা-ই। শুধু ভাবমূর্তিটি একটু নমনীয় করেছেন এবং জনসংযোগ বাড়িয়েছেন। এ সম্পর্কে লেখক ও বুদ্ধিজীবী জেন এম জ্যাকসন ভালো ব্যাখ্যা করেছেন :‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টাকারী দলগুলোর অন্যতম ছিল ইউনাইটেড ডটার’স অব দ্য কনফেডারেসি। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৯৪ সালে। এই সব ডটার চরম উগ্রবাদী হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট কেকেকের পাশাপাশি আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে তত্পর ছিল। ওরা একসঙ্গে মিলে কনফেডারেট জেনারেল ও সেনাদের স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করত, বিশেষ করে যারা ওদের পারিবারিক সদস্য ছিল। যদিও ওরা ইতিহাস রক্ষার দোহাই দিয়েছে। কিন্তু ওরা আসলে আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে সেই সব রাজ্যকে, যারা ইউনিয়ন থেকে আলাদা হয়ে যেতে চেয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ওরা কনফেডারেশনের আদর্শ ধরে রাখতে চেয়েছিল।’

জ্যাকসন তার লেখায় যে বর্ণনা করেছেন তা হলো অতীতে শ্বেতাঙ্গ মেয়েরা হোয়াইট সুপ্রিমেসির জন্য কী করেছে, তার একটি বর্ণনা। আজ যে কনফেডারেট স্মৃতিফলকগুলো টেনে নামানো হচ্ছে, তা ঐ নারী সংগঠনগুলো তৈরি করেছিল, যারা ক্লু ক্লাক্স ক্ল্যানের (কেকেকে) সঙ্গে মিলে কাজ করত। জ্যাকসন তার লেখায় বলেছেন, বর্তমানে হয়তো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে নারীর ভূমিকা নিয়ে সবাই নীরব, কিন্তু ইতিহাস যথেষ্টই সোচ্চার। এই নারী নিবন্ধকার জোর দিয়ে বলেছেন যে, অমেরিকায় যে বর্ণবাদ প্রোথিত হয়েছিল, তাতে দ্বিতীয় ভূমিকা রেখেছিলেন শ্বেতাঙ্গ নারীরা। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে যে ভূমিকা তারা রেখেছিলেন, তা ভোলার নয়।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধকার চার্লস এম ব্লো জ্যাকসনের নিবন্ধের যুক্তিকে আরো সম্প্রসারিত করে বলেছেন, ‘We often like to make white supremacy a testosterone fueled masculine expression, but it is just as likely to wear heels as a hood.’

বিষয়টি আমাদেরকে কেলেই ম্যাকএনানির কথা ভাবতে সাহায্য করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে থেকে উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদী কর্মকাণ্ড এবং কথাবার্তায় সমর্থন দিয়ে তিনি যা করছেন, তার সঙ্গে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের আগে-পরের সেই শ্বেতাঙ্গ সমর্থক নারীদের কর্মকাণ্ডের পার্থক্য কী? ম্যাকএনানি ট্রাম্পের জন্য যা করছেন তা কি হোয়াইট সুপ্রিমেসির পদাঙ্ক অনুসরণ নয়? যেভাবে সেই ডটাররা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে কনফেডারেশনকে ব্যবহার করেছেন ঠিক একই পথে ম্যাকএনানি শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করতে চেষ্টা করে চলেছেন।

ম্যাকএনানির সবচেয়ে চমকপ্রদ কৃতিত্ব পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের দেখা গেছে। ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের কাছেই সেন্ট জন চার্চে যাওয়ার জন্য প্রতিবাদকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করে টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে সমালোচনার মুখে পড়লে ম্যাকএনানি তাকে প্রেস ব্রিফিংয়ে উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেছেন যে, প্রেসিডেন্টের শক্তিশালী বার্তা হলো এই লুণ্ঠনকারীরা দাঙ্গাকারী এবং নৈরাজ্যকারীরা সফল হতে পারবে না। চার্চে আগুন দেওয়া আমেরিকার জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো নৃত্য পরিচালনা করেননি বরং তিনি সাহসের সঙ্গে আমেরিকার জনগণকে বুঝিয়েছেন যে, আমরা সংহতির সঙ্গে, বিশ্বাসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি।

এটাই শুধু ম্যাকএনানির ডায়াসে দাঁড়িয়ে চোয়াল-ফাটানো দক্ষতা নয়। সেন্ট জনের ঘটনার আগে রিপোর্টাররা জানতে চেয়েছিলেন করোনা ভাইরাসের মধ্যে ট্রাম্পের জন্য প্রার্থনা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখা নিরাপদ কি না। ম্যাকএনানি সরাসরি তার বসের কথাই পুনরুল্লেখ করেছেন। বলেছেন, সেই কক্ষে থাকাটাই ইন্টারেস্টিং, যেখান থেকে চার্চ ও প্রার্থনাঘরগুলো বন্ধ রাখাটাই কাঙ্ক্ষিত বিবেচনা করা হয়। সমালোচনাকারী যারা ভাবেন ম্যাকএনানিকে সেই ডটারদের সঙ্গে তুলনা করা হয়তো একটু বাড়াবাড়ি। যারা এই প্রেস সেক্রেটারিকে ছাড়পত্র দেবেন, তারা বলবেন, ম্যাকএনানি তার দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করেছেন। সোজা হিসাব। কিন্তু তিনি এমন একটি সময় ট্রাম্প প্রশাসনে নিজেকে দক্ষ ও মানানসই করে তুলতে পেরেছেন, যখন শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব আমেরিকায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে; এমন একজন প্রেসিডেন্টের অধীনে যিনি বর্ণবাদকে উসকে দিচ্ছেন। এই মিথ্যাচারকে যারা স্বাভাবিকভাবে দেখতে চান, তারাও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিপজ্জনক।

(লেখাটি ইংরেজি থেকে অনুদিত)

n লেখক :যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ