ড. মো. ফখরুল ইসলাম
শিক্ষায় ভার্চুয়াল রূপান্তরকে স্থায়ীভাবে সাজিয়ে আধুনিক শিক্ষাকাঠামো নিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে হবে। সরকারিভাবে শিক্ষার রূপকল্প ২০৪১ পরিকল্পনার সঙ্গে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় যদি একটি শক্ত অবকাঠামো দাঁড় করানো যায় তাহলে সেটা শিক্ষার আধুনিকায়নকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে। এর মাধ্যমে শিক্ষাব্যয়ের অনেকটা সংকোচন হবে এবং অপচয় রোধ হবে।
এজন্য যেসব কাজে হাত দিতে হবে সেগুলো বিভিন্ন মাঠ গবেষণায় প্রায় অনেকটাই বের হয়ে এসেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত মাঠ গবেষণা ফলাফলে জানা গেছে—অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন পাঠদানের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। অনেক শিক্ষার্থীর আর্থিক সচ্ছলতা নেই। অনেকেই গ্রামে-গঞ্জে বাস করায় নেট একসেস নেই এবং যাদের রয়েছে, তাদেরগুলো ধীরগতিসম্পন্ন। শহরাঞ্চলে বসবাসকারী শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ পেলেও তারাও ততটা তত্পর বা মনোযোগী নয়। সব মিলিয়ে শতকরা ৩০-৫০ ভাগ অনলাইন ক্লাশে অনুপস্থিত থাকে।
তবু সমস্ত সমস্যা মিটিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন পাঠদানের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এজন্য একটি কমন প্লাটফরমের কথা শিক্ষামন্ত্রী সংসদে বলেছেন। এই প্লাটফরম তৈরির কাজটা কিভাবে হবে এবং কতদিনের মধ্যে সেটা বাস্তবায়ন করা যাবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আরেকটি বিষয় কেউ ভাবেননি। সেটা হলো—এ পর্যন্ত নেটে যে তত্পরতা দেখা গেছে সেগুলো অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নবীন শিক্ষকদের প্রচেষ্টা। নবীন শিক্ষকরা ভার্চ্যুয়াল ক্লাসে বেশি অংশগ্রহণ করছেন। প্রবীণ বা বয়স্ক শিক্ষকগণ আধুনিক প্রযুক্তি ও শিক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে। তত্ত্বীয় ও মানবিক ধারার বিষয়গুলোতে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তাঁদের কেউ কেউ এগুলো পছন্দ করেন না। কেউ আবার ঘোর সমালোচনা করেন পাওয়ার পয়েন্টে স্লাইড ব্যবহার করে ক্লাশ নেওয়ার। ক্লাসে গিয়ে সিলেবাস ও টপিক বহির্ভূত আলোচনা করে সময় কাটানো শিক্ষক এখনো অনেক আছেন। অনলাইনের ক্লাস কেউ রেকর্ড করতে পারে এই সংকোচে তাঁরা এই আধুনিক ব্যবস্থায় মোটেও সায় দেন না বরং অনেকে এর সমালোচনা করেন। এটার ওপরও খানিকটা গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।
অনেকে গবেষণা নেটওয়ার্ক অনুসন্ধান ও অনলাইন লাইব্রেরির কাছে ঘেঁষেন না। কম্পিউটারে টাইপ করতেও জানেন না। ই-কন্টেন্ট তৈরি করতে জানেন না। এ ব্যাপারে তাঁদের নিজেদের মাইন্ড সেট করাটাও বেশ দুরুহ ব্যাপার।
এখন আসি সমস্যাগুলো উতরে অনলাইন শিক্ষায় কিভাবে সফল হওয়া যাবে—
গরিব শিক্ষার্থীদের সরঞ্জাম ধার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার লাইব্রেরিতে যেভাবে বই ধার দেওয়া হয় সেভাবে নোটবুক, নেটবুক, ল্যাপটপ, পামটপ, স্মার্টফোন, রাউটার, হেডফোন ইত্যাদি কার্ডের মাধ্যমে ধার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্র্যাকটিক্যাল রিসার্চ ও ফিল্ডওয়ার্কের জন্য বিকল্প ভাবনায় গ্রেডিং প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ওপেন বুক সিস্টেমে দীর্ঘ সময়ব্যাপী অনলাইনে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে যেটা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত রয়েছে। আমাদের দেশে সারদা পুলিশ একাডেমীতেও অনেক কোর্সের ওপর ওপেন বুক পরীক্ষা নেওয়া হয়। বিশেষ করে আইন ও জটিল তত্ত্বীয় বিষয়গুলোর জন্য।
পৃথিবীর অনেক দেশে শুধু লেকচার শুনলে বা অংশগ্রহণ করলেই কোর্স সমাপনির পরিবর্তে শুধু অংশগ্রহণের সনদ দেওয়া হয়ে থাকে। সেখানে ক্লাসের মধ্যেই প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকে এবং টকশোর মতো কোনো বিষয়কে ব্যাখ্যা করার জন্য সুযোগ দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও উত্সাহ জানা যায়। আমাদের দেশেও সেটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাহলে পরীক্ষাভীতি ও নকল প্রবণতা কমে আসবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান
