অণুগল্প

তবু ট্রেনিং চাই

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২০, ২১:৫৭

 

সীমান্ত শহরটি লোকজনের আনাগোনায় ভিড়-ভাড়াক্কায় টইটম্বুর। এমনিতে শান্ত মফস্বল শহর। হঠাত্ করেই একদিন সীমান্তের ওপার থেকে দলে দলে লোক এসে ভিড় জমাতে শুরু করল। লোকগুলোর শুকনো মুখ। চোখেমুখে আতঙ্ক। নাওয়া নেই খাওয়া নেই। ভিন জাতির অন্যায় হামলায় ঘরবাড়ি সহায় সম্পদ সব ফেলে শুধু জানটুকু দেহে ধারণ করে ছুটে এসেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছের শহরে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। এখানকার লোকরাও আন্তরিকতা নিয়ে তাদের গ্রহণ করেছে, আশ্রয় দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চালাতে সহযোগিতা দিচ্ছে। এভাবেই তো কেটে গেল কয়েক মাস। ভিড় এতোটুকু কমেনি। শরণার্থী, মুক্তিযোদ্ধা আর যুব শিবিরের লোকজনে শহর জনারণ্য। স্বাধীন বাংলার তিন ছাত্রনেতা এক বিকেলে শহরের রাস্তায় হাঁটছিলেন। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলেন। তাঁদের পথ আগলে দাঁড়ালেন এক বয়স্কলোক। বয়স হবে প্রায় ষাট বছরের কাছাকাছি। বোঝাই যাচ্ছে গাঁয়ের সাধারণ অশিক্ষিত লোক। কিন্তু চোখ দুটো জ্বলজ্বলে। স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রনেতাদের রাস্তার উপরেই দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। একজন জানতে চাইলেন—আমাদের কাছে এসেছেন?

বয়স্ক লোকটি স্পষ্টভাষী। কথা বলেন সরাসরি। কোনো ভান-ভণিতা ছাড়াই। বললেন, তোরা নেতা মানুষ। তোদের কাছেই তো আসছি।

: কী চান আমাদের কাছে? কী করতে পারি?

এবার বয়স্কের কণ্ঠে প্রবল মিনতি : আমারে একটা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা কইরা দে।

: কিসের ট্রেনিং?

বয়স্কের দাঁতগুলো ঝকঝকে হয়ে ওঠে অনাবিল হাসিতে। বলেন, ট্রেনিং আর কিসের হয়! মুক্তির! যুদ্ধের!

ছাত্রনেতারা অবাক হয়ে দেখেন লোকটাকে। বয়স হয়েছে বটে, কিন্তু শরীরটা পেটানো, গায়ে গতরে এখনো বল ধরে। তারও চাইতে শক্ত ও জোরদার তার মনোবল। তাঁর চোখের ভাষা মুখভঙ্গির অভিব্যক্তির দৃঢ়তা দেখেই তা  বোঝা যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধে শামিল হতে দলে দলে ছেলে যুবা কৃষক শ্রমিক ছাত্র আসছে। তারা ট্রেনিং চায়। অস্ত্র চায়। দেশের স্বাধীনতার জন্য পুরো জীবনটাই বাজি রাখতে চায়। জীবন উত্সর্গ করতে চায়। গ্রাম থেকে আসা এই বয়স্ক লোকটার চাহিদা যেন তাদের চাইতেও প্রবল। ছাত্রনেতাদের একজন তাঁর কাঁধে হাত রাখলেন। পরম মমতায় বললেন : বাবা, এই বয়সে আপনি ট্টেনিং নিয়ে কী করবেন?

বয়স্ক সকাতরে বললেন, আমারে শুধু ব্যবস্থাটা কইরা দে। তারপর দ্যাখ আমি কী করি। ক্যামনে কইরা পাকিস্তানি জল্লাদগুলারে একে একে খতম করি।

পাকিস্তানি জল্লাদ বলতে গিয়ে তার মুখে যে ঘৃণার অভিব্যক্তি প্রকাশ পেল, তা থেকে তার সংকল্পের দৃঢ়তা সুস্পষ্ট।

জিজ্ঞেস করা হলো : আপনার বাড়িতে আর কে কে আছে?

এক গাল হেসে বয়স্কের নির্ভার জবাব : কেউ নাই।

তিনজনেই অবাক। কেউ নেই এ কথাটা কেমন নিরুদ্বেগে অবলীলাক্রমে বলে দিচ্ছেন। কেউ নেই বলেই কি তিনি নিজের জানের মূল্য দিচ্ছেন না?

দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞাসা : কেউ নেই মানে? ছেলেমেয়ে কেউ না?

: তিনটা ছেলে আছে। মুক্তিযুদ্ধে দিয়ে দিয়েছি।

তাঁরা অবাক হয়ে তাকালেন বয়স্কের দিকে। কেমন দিব্বি বলে দিলেন ছেলেদের যুদ্ধে যোগদানের কথা। মুক্তিযুদ্ধ যেন জীবনের প্রাত্যহিক অংশ।

জিজ্ঞেস করা হলো : শুধুই তিন ছেলে? আর কেউ নেই?

বয়স্ক যেন একটু লজ্জা পেলেন। মুখ নিচু করে বললেন, আছে তো। একটা বৌ। বুড়িকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে এসেছি।

এবার তিনি মুখ তুলে তাকালেন তিন ছাত্রনেতার পানে। ব্যাকুল হয়ে বললেন, আমার আর কোনো পিছুটান নাই। তোরা শুধু আমার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থাটা কইরা দে।

ওরা বাকরুদ্ধ। ওদের চাইতে বয়সে আড়াইগুণ-তিনগুণ বড়ো এক বয়স্ক লোক তার সবকজন ছেলেকেই পাঠিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। বৌকে রেখে এসেছেন আত্মীয়ের বাড়ি। মুক্তিযুদ্ধে তাঁকে যেতেই হবে। তাঁর চোখেমুখে ঋজু দেহে যোদ্ধার প্রত্যয়।