মুসলমানদের বৃহত্ ধর্মীয় উত্সব ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ সামনেই। এই ঈদের মূল উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি দেওয়া। কিন্তু এ বছর বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে পালটে গেছে দৃশ্যপট। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই করোনার আতঙ্ক। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও করুণ। কোরবানি দেওয়ার মতো আর্থিক অবস্থা অবশিষ্ট নেই অনেকেরই। যারা প্রতি বছর এককভাবে কোরবানি দিয়ে আসছেন, তারাও অনেকে এবার বাধ্য হবেন ‘শেয়ারে’ বা ভাগাভাগি করে কোরবানি দিতে। এবার দেশে চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হলেও খামারিরা শঙ্কায় আছেন উপযুক্ত দাম ও বিক্রি নিয়ে। খামারিরা বলছেন, পশু বিক্রি না করতে পারলে বছর জুড়ে খাটানো টাকার পুরোটাই লোকসান হয়ে যাবে। কোরবানির হাটে পশু বিক্রি কম হলে দাম পড়ে যাবে। এতে অনেক খামারি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন। আর প্রতিবেশী দেশ থেকে চোরাই পথে গরু এলে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দাবি, করোনা ভাইরাসের কারণে এবার কোরবানির পশু ৫ থেকে ১০ শতাংশ কম বিক্রি হবে।
এবার উদ্বৃত্ত হতে পারে ২৩ লাখ পশু
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কোরবানির জন্য সারা দেশের খামারগুলোতে সম্ভাব্য প্রস্তুত আছে ১ কোটি ১৯ লাখের বেশি গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া। এছাড়া গত তিন মাসে করোনার কারণে নিয়মিত বাজারে অর্ধেকেরও কম গবাদিপশু বিক্রি হয়েছে। এমন প্রায় ১০ লাখ অবিক্রীত পশু কোরবানির হাটে বিক্রির জন্য তোলা হবে। সবমিলিয়ে ধরা যায় এবার ১ কোটি ২৯ লাখ পশু বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আব্দুল জব্বার শিকদার বলেছেন, দেশে কোরবানির যে পশু আছে সেটা ‘সারপ্লাস’ বা উদ্বৃত্ত হবে এবার। গত বছর আমাদের কোরবানিযোগ্য পশু ছিল প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে জবাই করা হয়েছিল ১ কোটি ৬ লাখ। গত বছরের প্রস্তুতকৃত প্রায় ১২ লাখ পশু সারপ্লাস ছিল। গত বছরের হিসাব ধরলে এবার উদ্বৃত্ত হবে প্রায় ২৩ লাখ পশু। এছাড়া করোনার বিরূপ প্রভাবের কারণে বিক্রি কম হবে। ফলে খামারিদের জন্য সেটা চিন্তার কারণ। ইতিমধ্যে করোনার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলায় গরুর হাটের সংখ্যাও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পশুহাট হ্রাস করার জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ষাটোর্ধ্বদের পশুর হাটে যেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
খামারিদের উদ্বেগ
খামারিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কোরবানিকে টার্গেট করে চার-পাঁচ মাস আগে থেকে মোটাতাজাকরণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন তারা। করোনার কারণে সবকিছু বন্ধ থাকায় গো-খাদ্যের দামও চড়ে যায়। পরিবহনসংকটে গো-খাদ্যের অভাবও দেখা দেয়। বড় খামারগুলোতে সংকট দেখা দিয়েছে গরু পরিচর্যাকারী শ্রমিকেরও। অনেকে গ্রামের বাড়িতে অঘোষিত লকডাউনে গৃহবন্দি ছিলেন। করোনার আগে এক বস্তা (৩৭ কেজি) গমের ভুসির দাম ছিল ১ হাজার ১০০ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪৫০ টাকা। শুধু গমের ভুসি নয়, সব গো-খাদ্যের দাম গড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
রাজধানীর কেরানীগঞ্জ উপজেলার নতুন সোনাকান্দা এলাকার গরুর খামারি মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘এবারের কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্য ২২টি গরু প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা করতে অনেক টাকা পুঁজি খাটিয়েছি। তবে বিক্রি হবে কি না, জানি না। করোনাকালে নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্তদেরও আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। তাই উপযুক্ত দাম পাওয়া নিয়ে তিনি শঙ্কায় আছেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাদিক অ্যাগ্রো লিমিটেডে কোরবানির জন্য গড়ে প্রস্তুত করা হয় ১ হাজার ৫০০ পশু। প্রতিষ্ঠানের মালিক ইমরান হোসেন বলেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলে গত বছর থেকে কম বিক্রি হবে। খামারিদের মাথায় হাত উঠবে। একই রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আরো অনেক খামারি। গাবতলীর পশুহাটের বিশিষ্ট গরু ব্যবসায়ী লুত্ফর রহমান বলেন, পশু ব্যবসায়ীদের মধ্যে মারাত্মক হতাশা বিরাজ করছে। অন্যান্য বারের মতো এবার ব্যবসা হবে না।
এবার কোরবানি কম হবে :পশুসম্পদ মন্ত্রী
মত্স্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, দেশে কোরবানিযোগ্য পশু পর্যাপ্ত। এবার কোরবানির জন্য পশু আমদানি নয়, রপ্তানিযোগ্য পশু আছে। ধারণা করা হচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানি কম হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে বসবে হাট। তবে অনলাইনে এবার পশু কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রদ্বয় এরই মধ্যে বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবার সীমিত আকারে হাট বসানোর ব্যবস্থা করছেন তারা। ঢাকায় ২৫টি হাট বসবে বলে তারা জানান।
অনলাইনে বিক্রি বাড়বে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, পশুর হাট হতে পারে করোনা বিস্তারের অন্যতম স্পট। এবার দেশের পরিস্থিতিটা অস্বাভাবিক, সে কারণে অনলাইনে বিক্রির পরিমাণটা অন্য বছরগুলোর তুলনায় বাড়বে। কারণ এই পরিস্থিতিতে ভিড় ঠেলে অনেকে বাজারে যেতে চাইবে না। তাছাড়া এখন অনলাইনে গরুর চেহারা দেখা যায়, ওজন জানা যায়। এমনকি একটি পশুর মাংস কতখানি হবে—সেটাও জানা সম্ভব। একাধিক ব্যবসায়ী বলেছেন, গত কয়েক বছরে অনলাইনে পশুর হাটের জনপ্রিয়তা ঊর্ধ্বমুখী। অনলাইনে পশুর হাটের কেনাকাটা এ বছর আগের সব ইতিহাসকে ছাপিয়ে যাবে।
আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ‘লাম্পি স্কিন ডিজিস’
সাম্প্রতিককালে গবাদিপশুর মধ্যে ‘লাম্পি স্কিন ডিজিস’ ভাইরাস ছড়াচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। এই রোগে আক্রান্ত হলে প্রথমে গরুর শরীরের বিভিন্ন স্থান ফুলে গুটি হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে গরুর শরীরের তাপমাত্রা (জ্বর) বেড়ে যায়। দুই-তিন দিনের মধ্যে গুটিগুলো ফেটে পানি ঝরে। একপর্যায়ে ক্ষতগুলো পচে গরুর শরীর থেকে মাংস খসে পড়ে। এ সময় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই গরুর শরীরে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ভাইরাস দেখা দিয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশেও এই ভাইরাস ঢুকেছে। এর সঠিক কোনো প্রতিষেধক বের হয়নি। মশা ও মাছির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে রংপুর বিভাগের আট জেলায় এ ভাইরাসে অর্ধলক্ষাধিক গরু আক্রান্ত হয়েছে, আর মারা গেছে ৩ শতাধিক। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের তথ্য বলছে, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার প্রতিটি উপজেলায় প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার গরু বিরল এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ২ শতাংশ গরু মারাও গেছে।
