সীমিত পরিসরে সবকিছু খুলে দেওয়া হলেও খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হচ্ছেন না। বর্তমানে মানুষের বেশিরভাগ সময় কাটছে অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিশেষ করে যুবক ও তরুণরা সবচেয়ে বেশি মনোযোগী অনলাইনের এই মাধ্যমে। এই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সাইবার অপরাধীরাও। এই সময়ে ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে সাইবার অপরাধ। গত তিন মাসে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজমের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর আগে যেখানে মাসে সর্বোচ্চ ৫০টির মতো অভিযোগ আসত। খুব বেশি তদন্তের সুযোগ না থাকায় অধিকাংশ অভিযোগেরই সুরাহা হচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এসব অভিযোগের সুরাহার কথা বলছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজমের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের উপ-কমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, করোনার আগে সশরীরে এসে ১০ থেকে ১৫ জন আর অনলাইনে ২৫/৩০টি অভিযোগ আসত। এখন শুধু এপ্রিল মাসেই ৭০০র বেশি অভিযোগ এসেছে। এর সবগুলোই অনলাইনে। ফেসবুক, হোয়াটসআ্যাাপ, ইমো আইডি হ্যাক করে প্রতারণা, আপত্তিকর লিংকের পাশাপাশি গুজবও ছড়ানো হচ্ছে। এছাড়া ভুয়া আইডি তৈরি, ব্ল্যাকমেইলিং, ফেসবুকে আপত্তিকর স্ট্যাটাস, কুত্সা রটানোর মতো ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে বিকাশের মাধ্যমে প্রতারণার সংখ্যাটা বেশি। সশরীরে গিয়ে বা কাউকে ডেকে নিয়ে তদন্তের সুযোগ যেহেতু এই পরিস্থিতিতে কম, তাই ফোন এবং অনলাইনে যতটুকু সম্ভব সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই সংখ্যাটা খুব বেশি হবে না। তবে সবগুলো অভিযোগই নথিভুক্ত করে রাখা হচ্ছে।
অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘বর্তমানে সবাই অনলাইনে বেশি সময় দিচ্ছে। ফলে সাইবার অপরাধীরা বিভিন্নভাবে তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে, বিভিন্ন গুজব ছড়াচ্ছে। তাদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি সাইবার বুলিং নিয়ে একটি গবেষণা করে দেখা গেছে, যারা বেশি সময় অনলাইনে কাটায় তারাই বেশি সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছে। কেনাকাটাসহ নানা ধরনের প্রতারণার ফাঁদ পেতে রেখেছে অপরাধীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যারা সাইবার ক্রাইমের বিষয়টি মনিটরিং করেন তারা এখন করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতেই ব্যস্ত। ফলে এটারই সুযোগ নিচ্ছে সাইবার অপরাধীরা।
কিছুদিন আগে সাইবার অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর মগবাজার এলাকা থেকে সবুজ খন্দকার (২৮) নামে এক তরুণকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ঐ তরুণ ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, চলচ্চিত্র জগতের অনেকেসহ উচ্চপদস্থ ও গণ্যমান্য ব্যক্তির নামে হুমকি, কটূক্তি ও মানহানিকর অশ্লীল বার্তা বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাঠাত। এমন অভিযোগ এখন বাড়ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডা। এখন তো সবাই ঘরে অলস সময় কাটাচ্ছে, ফলে তাদের মাথায় নানা ধরনের শয়তানি কাজ করছে। তবে আমাদের লোকজন তাদের কঠোরভাবে মনিটরিং করছে। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। এরই মধ্যে কয়েকজনকে আমরা গ্রেফতারও করেছি।’
বিশেষ করে গুজব ও মিথ্যা তথ্য প্রচারের হিড়িক পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাইবার অপরাধীদের বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। একজন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ বলেন, আমরা একটা গবেষণায় দেখেছি, সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ৯০ ভাগেরই বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইমের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের ৫১ দশমিক ১৩ শতাংশই নারী। আর নারীদের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের কম। তারা বলেন, মানুষ ঘরবন্দি থাকার কারণে অপরাধগুলো প্রকাশ্যে আসছে না। তবে গৃহবন্দি অবস্থায় অনেকেই এটা নিয়ে মহা বিপাকে আছেন।
সমপ্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটিয়ে চট্টগ্রামে গ্রেফতার হয়েছেন ইফতেখার মোহাম্মদ আদনান, এ বি এম রেজা ও কামরুল হাসান নামে তিন ব্যক্তি। ফেসবুকে করোনা ভাইরাস মুক্তির ওষুধ বিক্রির ঘোষণা দেওয়ায় মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয় মনসুর আলী নামে এক যুবককে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্মানিত ব্যক্তিদের চরিত্র হনন করায় গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন বেশ কয়েকজন ব্যক্তি।
অপরাধবিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে আমরা এই ধরনের অপরাধের ব্যাপকতা দেখছি। এর জন্য যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটা খুব বেশি নেওয়া হচ্ছে বলেও মনে হয়নি। প্রতিটি পরিবারেই তরুণ-তরুণীরা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছেন। ফলে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
