৬৮ বছরে পা রাখলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। গতকাল বৃহস্পতিবার নানা আয়োজনে পালন করা হলো প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সোসাইটির সদস্যদের আড্ডা এবং স্মৃতিকাতর স্মৃতিচারণার পাশাপাশি ছিল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একক বক্তৃতা পর্ব। এদিকে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন গতকাল সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর।
সকালে জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্যদিয়ে শুরু হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা। এরপর সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম ও সাধারণ সম্পাদক ড. সাব্বীর আহমেদ শান্তির প্রতীক সাদা কবুতর ও বেলুন উড়িয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন করেন। এরপর ‘রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক এবং তার পরে’ শীর্ষক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক বক্তৃত্বা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। একক বক্তৃতায় তিনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সম্পর্ক, সম্পর্কের পটভূমি এবং ওই দুই কবির প্রস্থানের পরের সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেন। সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক ড. সাব্বীর আহমেদ।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহত্ কবি। বাংলার কবিদের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ। বিশ্বসাহিত্যে গীতি কবিতার ক্ষেত্রে এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের তুলনার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তবে নজরুলও মহত্ এবং বাংলা কবিতার ইতিহাসে প্রতিভা ও অর্জনের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের পরেই তাঁর স্থান। প্রথম ও দ্বিতীয় মধ্যে দূরত্ব অবশ্য দুর্লঙ্ঘ। কিন্তু তারা একে অপরের থেকে পৃথক, মহত্ত্বই তাদেরকে পৃথক করে দিয়েছে। স্মরণে রাখার মতো বিষয় হলো— নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবন ছিল মাত্র ২২ বছরের, রবীন্দ্রনাথের সময়ের তিন ভাগের এক ভাগ।
এদিকে, এশিয়াটিক সোসাইটির ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল থেকে সর্বসাধারণের জন্য এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর উন্মুক্ত করা হয়েছে। গতকাল সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক মাহফুজা খানম এক হাজার টাকা দিয়ে ৫০টি টিকেট ক্রয় করে জাদুঘর পরিদর্শনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। উক্ত ৫০টি টিকেট উপস্থিত সম্মানিত সদস্যদের জন্য প্রদান করা হয়। এছাড়া ঐতিহ্য জাদুঘরের প্রধান গবেষণা সমন্বয়ক অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন আহমেদও ৫০টি টিকেট ক্রয় করে দর্শকদের সৌজন্য উপহার প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘরকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. জেবউন নেছা দুটি এবং নারায়ণগঞ্জের আলহাজ মু. জালাল উদ্দিন নলুয়া একটি নিদর্শন উপহার প্রদান করেন।
সাধারণ দর্শকদের জন্য এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর প্রতি শুক্র ও শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। শুক্রবার বেলা একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত নামাজের বিরতি। জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য দর্শকদের প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা, ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে ১০ টাকা এবং বিদেশি দর্শকদের জন্য ২০০ টাকা।
কী আছে এই জাদুঘরে: ঢাকার মোগল নায়েব নাজিমদের জন্য ২৫০ বছর পূর্বে নির্মিত প্রাসাদ ভবনের মূল অংশ সংরক্ষণের অভাবে ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। অবশিষ্ট অংশ রক্ষার লক্ষ্যে এই ভবনে জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। এই বিষয়ে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ বলেন, জাদুঘরটিতে পাঁচটি গ্যালারিতে নিদর্শনগুলো সাজানো হয়েছে । তার মধ্যে এক নম্বর গ্যালারিতে এশিয়াটিক সোসাইটির গঠন ইতিহাস, সোসাইটির প্রথম সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ড আহমেদ হাসান দানীর ছবিসহ উল্লেখযোগ্য আলোকচিত্র ও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ১৭০০-১৯০০ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও পূর্ব বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনভিত্তিক নিদর্শন দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে বাকি ৪টি গ্যালারি।
জাদুঘরের অনেক নিদর্শন ঢাকার বহু বনেদী ও সংস্কৃতিবান পরিবার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এখানে যেমন স্থান পেয়েছে ক্রম অনুসারে নায়েব নাজিমদের তালিকা এবং তাদের আলোকচিত্র , তেমনি আছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিদের আগমন ও প্রাসাদ নির্মাণের তথ্যাদি। ঢাকার জীবন ও শিল্পকর্ম শীর্ষক গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে সেই সময় ব্যবহার করা তৈজষপত্র, মসলিন শাড়ি,বিয়ের রেশমি শাড়ি, হুকা,পানির পাত্র,খাবার গরম রাখার প্লেট ইত্যাদি। এছাড়াও আছে মনিটর, ট্যাব ও টার্চস্ক্রিন, যার মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রদর্শিত হবে ঢাকার দুইশ’ বছরের ইতিহাস।
