বাংলাদেশে জরায়ু মুখের ক্যান্সারে যারা আক্রান্ত হন তাদের ৯৯ ভাগ বাল্যবিয়ের শিকার। ফলে দেশে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করতে পারলে জরায়ু মুখের ক্যান্সার অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে বলে জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাবেরা খাতুন। বিশ্বে জরায়ু মুখের ক্যান্সারে আক্রান্তের প্রধান কারণ ‘হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস’-(এইচপিভি) হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাল্যবিয়েই এই রোগে আক্রান্তের অন্যতম কারণ। তাই গত বছরের নির্ধারিত প্রতিপাদ্যটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এ বছরও একই প্রতিপাদ্যে ‘বাল্যবিবাহে জোর না’ রেখে চলতি জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় শনিবার জরায়ু মুখের ক্যান্সার দিবস পালিত হবে।
‘জননীর কাছে সবার আছে জন্মঋণ, জরায়ু মুখের ক্যান্সার সচেতনতায় অংশ নিন’— এই স্লোগান জানুয়ারি মাসব্যাপী জরায়ু মুখের ক্যান্সার সচেতনতা মাস পালন করছে জনসচেতনতা নিয়ে কাজ করা ক্যান্সারবিরোধী মোর্চা সংগঠন ‘মার্চ ফর মাদার’ ও ‘রোটারি ইন্টারন্যাশনাল জেলা-৩২৮১’। সরকারি মেডিক্যাল, ক্যান্সার ইনস্টিটিউটসহ ৩০০ সেন্টারে বিনামূলে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের স্ক্রিনিং ও ভায়া টেস্ট হয়। এর পাশাপাশি কমিউনিটি অনকোলজি সেন্টার ১২ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর ৭/৯, লালমাটিয়া, ব্লক-বি তে বিকাল ৩ টা থেকে ৫টা পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে ভায়া টেস্ট ও স্ক্রিনিং করানো হবে। শুক্রবার সেন্টারটি বন্ধ থাকবে। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও ক্যান্সার প্রতিরোধে মোর্চা সংগঠনের সমন্বয়ক ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, আমরা ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে ৫ বছর যাবত্ কাজ করছি। এরই ধারাবাহিকতায় গতবছর থেকে আমরা মাসব্যাপী সচেতনতার পাশাপাশি জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় ‘শনিবার’ জরায়ু মুখের ক্যান্সার সচেতনতা দিবস পালন করে আসছি।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) এর তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতিবছর ৫ লাখ ২৮ হাজার নারী জরায়ু মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন ২ লাখ ৬৬ হাজার। বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্ত নারীর হার ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, অর্থাত্ ১১ হাজার ৯৫৬ জন। এরমধ্যে মৃত্যুবরণ করেন ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাত্ ৬ হাজার ৫৮২ জন। এই জরায়ু মুখের ক্যান্সারে প্রতিদিন গড়ে মারা যান ১৮ জন নারী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে এখনো ৫০ ভাগ কিশোরীর বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে। সেখানে কেবল বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করেই অনেক নারীকে এই জরায়ু মুখের ক্যান্সার থেকে রক্ষা করা সম্ভব। কিশোরী বয়সে জরায়ু মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে ভ্যাকসিন নিলে এবং নিয়মিত টেস্টের মাধ্যমে রোগটি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে রোগী মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন। কিন্তু এই রোগটি সম্পর্কে এখনও সেভাবে সচেতনতা তৈরি হয়নি। তাই সচেতনতা বাড়াতে আমরা ‘জননীর জন্য পদযাত্রা’র আয়োজন করছি। আমাদের উদ্দেশ্য মানুষকে এই রোগটি সম্পর্কে সচেতন করা। যেন কোনো নারী জরায়ু মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা না যায়।
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার আরো বলেন, সচেতনতা দিবস উপলক্ষে আগামী ১২ জানুয়ারি (শনিবার) সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। এতে জরায়ু মুখের ক্যান্সারের চিকিত্সক ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন। আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, যেমন বিভিন্ন অফিস, গার্মেন্টসে আমরা বিনামূল্যে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম ও ভায়া টেস্ট করানো হবে। এতে করে সচেতনতা বাড়বে। ১২ তারিখ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর থেকে প্রতিদিন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন কর্মসূচি থাকবে। ১৩ জানুয়ারি সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজে, ১৯ জানুয়ারি সিলেট, এরপর নারায়ণগঞ্জ ও রাজশাহী কর্মশালা হবে এবং ২৬ জানুয়ারি ঢাকায় ‘জননীর জন্য পদযাত্রা’ কর্মসূচি পালন করা হবে। ডা. হাবিবুল্লাহ বলেন, আমাদের এই আয়োজনে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠন যুক্ত হতে পারবে।
