দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এখন ‘বারোভূঁইয়া’দের মতো প্রতিপত্তিশালী নেতা-পাতিনেতার জন্ম হইতেছে। বাংলার বারোভূঁইয়াদের অনেকে ছিলেন দেশপ্রেমিক ও সজ্জন ব্যক্তি; কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যকারী আজিকার বারোভূঁইয়ারা আবির্ভূত হইয়াছেন একেবারে রুদ্ররূপে। অত্যাচারী ও সীমালঙ্ঘনকারী এই সকল ভুঁইফোঁড় নেতার দৌরাত্ম্যে সংশ্লিষ্ট জনপদের মানুষ অতিষ্ঠ। স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও তাহাদের নাম শুনিলে তটস্থ হন। তাহারা প্রকাশ্য দিবালোকে নানা অন্যায়-অনিয়ম করিয়া যাইতেছে। তাহাদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি উচ্চারণ করিবে এমন দুঃসাহস কাহার! সচরাচর কেহ তাহাদের বিরুদ্ধে মামলা বা জিডি করিতে চাহেন না। কেননা তাহা করিলে রক্ষা নাই, নামিয়া আসিবে অকথ্য নির্যাতন এমনকি জীবননাশের হুমকিও। সাধারণত পুলিশ তাহাদের বিরুদ্ধে মামলা লইতে চাহে না বা গড়িমসি করে, কেননা তাহাদেরও আছে বদলি হইয়া যাইবার ভয় ও আতঙ্ক। তাহারা বা তাহাদের চ্যালাচামুণ্ডারা প্রকাশ্যে মেয়েদের অপহরণ করিয়া লইয়া যায়। বাড়িতে ঢুকিয়া হামলা করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তরে খোঁজ করিলে তথাকথিত এমন নেতাদের দেখা পাওয়াটা অস্বাভাবিক নহে।
বারোভূঁইয়া বলিতে মোগল সম্রাট আকবরের আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল শাসনকারী জমিদার বা ভূস্বামীগণকে বোঝায়। হিন্দুদের নিকট বারো সংখ্যাটি ছিল পবিত্র এবং বহুসংখ্যক অর্থে ব্যবহূত। এইজন্য আকবরনামাসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে বাংলার ভূঁইয়াদের যে তালিকা দেওয়া হইয়াছে তাহাতে তাহাদের সংখ্যা উল্লেখ করা হইয়াছে ১৩ এবং বিভিন্ন তালিকায় নূতন নূতন নামের সমাহার দেখা যায়। তাহার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েক জন হইলেন—ঈসা খাঁ, ইবরাহিম নরল, করিমদাদ মুসাজাই, কেদায় রায়, সুলতান গাজী, কাসিম গাজী, সোনা গাজী, আনোয়ার গাজী, বিনোদ রায়, প্রতাপাদিত্য, চাঁদ রায়, মুকুন্দরাম রায়, ফজল গাজী প্রমুখ। প্রকৃতপক্ষে তাহারা মূল রাজার অনুপস্থিতিতে বা অরাজক অবস্থায় রাজ্যের হর্তাকর্তা হইয়া যান। বাংলায় পাঠান কররানী বংশের রাজত্ব দুর্বল হইয়া পড়িলে সোনারগাঁও, খুলনা, বরিশাল প্রভৃতি অঞ্চলে কিছুসংখ্যক জমিদার স্বাধীন রাজার মতো রাজত্ব করিতে থাকেন। সম্রাট আকবর ১৫৭৫ সালে বাংলা দখল করিলে এই সকল জমিদার ঐক্যবদ্ধ হইয়া মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে তাহারা আত্মসমর্পণ করেন। মূলত স্বাধীন সালতানাতের পতনের পর (১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ) এবং বিশেষত শেরশাহের প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ লইয়া পূর্ব বাংলার ভাটি অঞ্চলে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হইলে এই সকল স্বাধীনচেতা বারোভূঁইয়ার উত্থান ঘটে।
আজিকার ‘বারোভূঁইয়া’রাও যেন কেন্দ্রীয় শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করিয়া চলিতেছেন। অর্থ-বিত্ত-বৈভবে ও ক্ষমতার দাপটে তাহারা এক শ্রেণির স্থানীয় জমিদারের রূপ লাভ করিয়াছেন। বর্তমানে তাহাদের সংখ্যা খুব বেশি নহে; কিন্তু এখনই দমন করা না গেলে এইরূপ ‘বারোভূঁইয়াদের’ সংখ্যা দেশে বাড়িতেই থাকিবে। তখন তাহাদের একে অপরের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করিয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটাও অস্বাভাবিক নহে। তাহাদের উত্থানে ও সংখ্যা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্র দিনদিন দুর্বল হইতেছে। তাহাদের বিরুদ্ধে যদি যথাসময়ে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করা না হয় এবং জনগণকে তাহাদের খপ্পর হইতে রক্ষা না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ইহার পরিণাম শুভ হইবে না।
