সাইবার অপরাধ থাকিবে, প্রতিরোধও থাকা চাই

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২০, ২১:৫৪

যেইখানে অধিক মানুষের আনাগোনা, সেইখানে অপরাধীরাও ফাঁদ পাতিয়া রাখে। করোনাকালে মানুষের অধিকাংশ সময় কাটিতেছে অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিশেষ করিয়া যুবক ও তরুণেরা সবচাইতে অধিক মনোযোগী অনলাইন প্ল্যাটফরমে। এই সুযোগে আগের তুলনায় অধিক সক্রিয় হইয়া উঠিতেছে সাইবার অপরাধীরাও। যেহেতু ইন্টারনেট এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সহজলভ্য, সেই কারণে সকল ধরনের সকল পেশা ও শ্রেণির মানুষ অনলাইনে, বিশেষ করিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত হইতেছেন। কাহারো স্মার্টফোন আছে; কিন্তু তাহার একটি ফেসবুক আইডি নাই—ইহা যেন এই সময়ে প্রায় অসম্ভব একটি ঘটনা। বর্তমানে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটিরও অধিক। এই বিপুলসংখ্যক লোক ফেসবুকে নিজের আইডি খুলিলেও তাহা যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে পারেন না। ফেসবুক মেসেঞ্জারে অসংখ্য ক্ষেত্রে নিজেদের খোলামেলা ছবি বন্ধু বা প্রেমিক-প্রেমিকার নিকট আদানপ্রদান করিয়া থাকেন। এই অবস্থায় কেহ যদি সুরক্ষার ফাঁকফোকর দিয়া ঐ ধরনের কোনো আইডি হ্যাক করিতে পারেন, তাহা হইলে ঐ সকল সংবেদনশীল ছবিও হ্যাকারের কবলে চলিয়া আসে। আর তাহা দিয়া খুব সহজেই সেই হ্যাকার সংশ্লিষ্ট আইডির স্বত্বাধিকারীকে ব্ল্যাকমেইল করিতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে হ্যাক হওয়া আইডি দিয়া নানা রকম আপত্তিকর ছবিও পোস্ট করিবার হুমকি দেওয়া হয়। সামাজিক সম্মানের জন্য অনেকেই হ্যাকারদের অর্থ দিয়া আইডি ফেরত নেন।

কেবল বাংলাদেশে নহে, গত ১০ বত্সরে বিশ্বে সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি পাইয়াছে আড়াই হাজার গুণ। সাইবার আইন সম্পর্কে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব অত্যন্ত প্রকট। তাহা ছাড়া সিংহভাগ স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর প্রযুক্তিজ্ঞানও খুব সামান্য। ফলে অনলাইনে নিজেকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখিতে হইবে, ইহা অধিকাংশ মানুষই জানেন না। এই জন্যই আমাদের দেশে অপরাধীদের কবলে পড়িতেছে হাজার হাজার মানুষ। মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতির ঘটনাও ঘটিতেছে অহরহ। ইহা লইয়া সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন টিজার নিয়মিত প্রচার করা হইলেও অপরাধ কমে নাই। তাহার কারণ ঐ অসচেতনতা। সংশ্লিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ের পরিচয় দিয়া একশ্রেণির প্রতারক গ্রাহকের নিকট হইতে নিত্যনূতন কৌশলে পাসওয়ার্ড নিয়া অর্থ হাতাইয়া লইতেছে। ইহা ছাড়া বিপুল পরিমাণ অর্থ বা উপঢৌকনের লোভ দেখাইয়া এবং ‘জিনের বাদশা’ পরিচয় দিয়াও অর্থ হাতাইয়া লইতেছে একটি চক্র। অনেক তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি এই ধরনের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়া অর্থ খুয়াইয়াছেন। সম্প্রতি করোনা-সংক্রান্ত প্রতারণা নূতন যুক্ত হইয়াছে। যেমন—মাস্ক, চশমা, স্যানিটাইজার, পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই)—এইগুলির কিছু ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়া অর্থ হাতাইয়া লইতেছে। অর্থ পরিশোধের পর কাঙ্ক্ষিত পণ্য মিলে না কিংবা যাহা মিলে তাহা নিম্নমানের। মুশকিল হইল, আমাদের এইখানে ডিজিটাল ফরেনসিকের বিষয়ে কোনো ন্যাশনাল পলিসি নাই। ডিজিটাল সার্টিফিকেশন দেওয়ার অথরিটি নাই।

আমাদের পুলিশকে সাইবার অপরাধমূলক তদন্তে দক্ষ হইয়া উঠিতে হইবে, যাহাতে আদালতে যাইয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাইবার ক্রাইমের প্রমাণ দিতে পারে। নচেত্ অধিকাংশ সাইবার অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া যাইবে। সময়ের সহিত আমাদের নিরাপত্তার সক্ষমতা বৃদ্ধি করিতে হইবে।