দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
লন্ডনে শুক্রবার ৩ জুলাই তারিখে বসে এই লেখাটা লিখছি। আমার পাঠকদের চোখে পড়বে ৫ জুলাই রবিবার। সেদিন আমার লেখাটি ইত্তেফাকে প্রকাশিত হওয়ার নির্ধারিত দিন। ব্রিটিশ আমলে এমনকি পাকিস্তান আমলেও ৩ জুলাই ছিল অবিভক্ত বাংলাদেশে একটি জাতীয় দিবস। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সব বাঙালি দিবসটি পালন করত। দিবসটি ছিল জাতীয় উদ্দীপনামূলক। দিবসটি পরিচিত ছিল ‘পলাশী দিবস’ রূপে। আজ থেকে ২৬৯ বছর আগে এই দিনে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌল্লাকে নির্মমভাবে বন্দিশালায় হত্যা করা হয়। সারা উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের সূচনা হয়।
দিবসটি স্মরণ করেই কবি নজরুল লিখেছিলেন— ‘কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,/ বাঙ্গালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!/ ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর/ উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নজরুলের ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শীর্ষক এই গান ঘরে ঘরে গাওয়া হতো। এখন গাওয়া হয় না। সম্ভবত বর্তমান কাণ্ডারীদের হুঁশিয়ার করে দেওয়ায় কোনো প্রয়োজন আমরা বোধ করি না। পশ্চিমবঙ্গে মুর্শিদাবাদসহ কয়েকটি জেলায় এখনো শহিদ সিরাজউদ্দৌল্লা দিবস হিসেবে ৩ জুলাই পালিত হয়। এই দিবস উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যথেষ্ট প্রেরণা জুগিয়েছে। পলাশীর যুদ্ধে সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ নবাবকে হত্যা করে সুবে বাংলায় ইংরেজ শাসনের সূচনা করেন। তারপর ১০০ বছর না যেতেই দিল্লির মোগল বাদশাহ বাহাদুর শাহকে সিংহাসনচ্যুত করে সারা উপমহাপদেশে ইংরেজরা তাদের অধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়, তার নাম ছিল সিপাহী বিদ্রোহ। তাও সফল হয়নি। নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা যুদ্ধে পরাজিত হননি। তিনি হয়েছিলেন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার। যেমন সিরাজ হত্যার ২১৮ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা তারই সেনাপতি জিয়াউর রহমান, রাজনৈতিক সহকর্মী খোন্দকার মোশতাকের বিশ্বাসঘাতকতায় (১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট) নির্মমভাবে নিহত হন। তিনিও কখনো পরাজিত হননি। ছিলেন বাঙালির অপরাজিত এবং অপরাজেয় নেতা। পলাশীর যুদ্ধের পর পরাধীন উপমহাদেশে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃত হন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠেন। প্রতি বছর ৩ জুলাই দিবসটি পালিত হতো। দৈনিক, সাপ্তাহিকসহ সব সংবাদপত্রে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার লাইফ সাইজ ছবি ছেপে ক্যাপসন দেওয়া হতো ‘বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব’। অবিভক্ত বাংলার অধিকাংশ স্কুলে ৩ জুলাই সিরাজউদ্দৌল্লাকে স্মরণ করে দিবসটি পালিত হতো। শহিদ নবাবকে স্মরণ করে নানা অনুষ্ঠান হতো। আমার ছেলেবেলায় এ ধরনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম।
নেতাজি সুভাষ বসু প্রথম নবাব সিরাজকে জাতীয় বীর (National Hero) হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি কলকাতা করপোরেশনের মেয়র থাকাকালে মুর্শিদাবাদে গিয়ে নবাবের সমাধিতে পুষ্পস্তবক রেখে ঘোষণা করেন, “You are not a fallen King, You are our national Hero” (আপনি পতিত রাজা নন, আপনি আমাদের জাতীয় বীর)। অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় ইংরেজরা একটি রাস্তার নাম রেখেছিলেন ক্লাইভ স্ট্রিট। তা পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা স্ট্রিট। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা শহর ছিল একটি জেলা শহর। এই শহরেও (এখন পুরনো এলাকা) প্রতিষ্ঠা করা হয় সিরাজউদ্দৌল্লা পার্ক। পাকিস্তান হওয়ার পর এই সিরাজউদ্দৌল্লা পার্কেই প্রথম রাজনৈতিক সভা হতো। তারপর সভার আকার বর্ধিত হওয়ায় তা চলে আসে সদরঘাটসংলগ্ন ভিক্টোরিয়া পার্কে (বর্তমানে বাহাদুর শাহ পার্ক)। ভিক্টোরিয়া পার্কে যখন জনসমাগম ধরত না, তখন সভাস্থল চলে যায় পল্টন ময়দানে। সেখান থেকে চলে যায় পুরোনো রেসকোর্স বা শহিদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এই উদ্যান থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন।
ব্রিটিশ আমলে নেতাজি সুভাষ বসু আরেকটি কাজ করেছিলেন অন্যায় যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যার পর ২২ বছরের যুবক নবাবের চরিত্রে নানা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে ব্রিটিশ শাসকেরা অনেক ইতিহাস লিখিয়েছিল। তার মধ্যে একটি ছিল, সিরাজ কলকাতা আক্রমণের পর ২০০ ইংরেজ সৈন্যকে বন্দি করে একটি গুহায় রেখে মৃত্যুবরণে বাধ্য করেছিলেন। সেই মৃত সৈন্যদের স্মরণে কলকাতায় একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়েছিল, যার নাম ছিল হলওয়েল মনুমেন্ট। বিখ্যাত গবেষক ও ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় গবেষণা করে প্রমাণ করেন, হলওয়েল মনুমেন্টের কিস্সা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানানো। ইংরেজরা নবাবকে হেয় করার জন্য এই মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়েছিল।
১৯৪১ সালে সুভাষ বসু এই মনুমেন্ট ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। তার এই আন্দোলন হলওয়েল মুভমেন্ট নামে খ্যাত। তিনি বিরাট মিছিল নিয়ে মনুমেন্টে যান এবং ইংরেজ শাসকদের চোখের সামনে তা ভেঙে ফেলেন। তার এই মিছিলে তখনকার অনেক বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা যোগ দেন। শেখ মুজিবকে তার বাবা শেখ লুতফুর রহমান চোখের অসুখের চিকিত্সার জন্য কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন। মনুমেন্ট ভাঙার মিছিলে মাত্র দুজন মুসলমান ছাত্র যোগ দিয়েছিলেন। তাদের একজন শেখ মুজিব।
পরবর্তীকালে কয়েক জন বিখ্যাত ব্রিটিশ অধ্যাপক পর্যন্ত স্বীকার করেন, হলওয়েল হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সম্পূর্ণ বানানো। প্রতিপক্ষকে গুন্ডা, বদমাশ, অত্যাচারী, স্বৈরাচারী হিসেবে চিত্রিত করে তাদের জাতির কাছেই হেয় করে রেখে নিজেদের স্বার্থ ও উদ্দেশ্য পূরণ সাম্রাজ্যবাদীদের একটি পুরোনো কৌশল। এই যুগে ইরাকযুদ্ধের সময়ও আমরা দেখেছি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে বিশ্বধ্বংসের মারণাস্ত্র আছে—এই মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে অন্যায় যুদ্ধে ইরাক দখল করে তাকে হত্যা করা হয়।
২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছবি (পলাশী থেকে ধানমন্ডি) করার সময় আমি মুর্শিদাবাদে গিয়েছিলাম। সেখানকার বাউল সম্মেলন ও মেলায় যোগ দিয়েছিলাম। একই সঙ্গে গিয়েছিলাম সিরাজউদ্দৌলার সমাধি জিয়ারতের জন্য। পাশাপাশি মাতামহ নবাব আলিবর্দী খাঁর সমাধি। এখন যেমন করোনা ভাইরাসের হামলায় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব বিপন্ন, তখন নবাবি আমলে সুবে বাংলা (বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা) বিপন্ন ছিল ভয়াবহ দস্যুদল বর্গি, হার্মাদ ও ওলন্দাজদের হামলায়। তারা শয়ে শয়ে নরনারী হত্যা করত। ফসল ও অন্যান্য সম্পদ লুট করত। সুন্দরী নারীদের ধরে নিয়ে যেত দাসী হিসেবে বিক্রয়ের জন্য। এদের ভয়ে তখন ছড়া তৈরি হয়েছিল, ‘ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে।’
বর্গিদের নেতা ছিল দস্যু ভার্গব। অসম্ভব নিষ্ঠুর চরিত্রের লোক। নবাব আলিবর্দীর পত্মী তার স্বামীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন নিজে সৈন্যবাহিনী পরিচালনা করে বর্গিদের পরাজিত ও ভার্গবকে হত্যা করার জন্য। আলিবর্দী তা-ই করেছিলেন। তিনি দিল্লির অধীনতা অগ্রাজ্য করে সুবে বাংলাকে কার্যত স্বাধীন করেছিলেন। সিরাজউদ্দৌলা মুঙ্গের ও গঙ্গাতীরের যুদ্ধে হার্মাদ ও ওলন্দাজ দস্যুদের পরাজিত করে সুবে বাংলাকে তাদের নিয়মিত অত্যাচার ও লুণ্ঠন থেকে মুক্ত করেন। তিনি কলকাতা-যুদ্ধেও ক্লাইভকে পরাজিত করেন। ক্লাইভ প্রাণ বাঁচানোর জন্য মাদ্রাজে পলায়ন করেন। পলাশীর যুদ্ধেও ইংরেজ সৈন্যরা শুধু পরাজিত হওয়া নয়, নির্মূল হয়ে যেত, যদি মীরজাফর ও তার সহযোগী নব্য ব্যবসায়ী দল নবাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করত।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নবাব সিরাজউদ্দৌলার নামে ঢাকায় কোনো রাস্তার নামকরণ না হলেও ডাক বিভাগ তার ছবিসহ ডাকটিকিট প্রবর্তন করেছে। অনেক ইতিহাসবিদ এ কথাটা জেনেও গুরুত্বের সঙ্গে লেখেননি যে মোগল আমলে সুবে বাংলায় যারা নবাব ছিলেন, তারা দিল্লির অধীনতা মেনে প্রতি বছর বিরাট অঙ্কের অর্থ দিল্লিতে পাঠিয়ে মোগল ঔপনিবেশ হিসেবে দেশটি শাসন করতেন। আলিবর্দী সুবে বাংলা দখল করে মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে বসে দিল্লিতে বার্ষিক কর ও নজরানা পাঠানো বন্ধ করে দেন। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত সুবে বাংলা কার্যত স্বাধীন হয়ে যায়।
নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমলে সুবে বাংলা দিল্লির সর্বপ্রকার অধীনতা থেকে মুক্ত হয়। দিল্লির মোগল বাদশাহের ফরমান সুবে বাংলায় অচল বলে ঘোষণা করা হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দিল্লির মোগল বাদশাহ বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার যে অনুমতি দেন, সেটা সিরাজ বাতিল করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্লাইভ প্রথম নবাব সিরাজকে ‘মহামান্য পিতা’ সম্বোধন করে চিঠি লিখে সুবে বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার আবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দেওয়ার আবেদন জানান। পরে এই আবেদন নিয়ে নিজে নবাবের দরবারে এসে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে থাকেন। নবাব সিরাজের সঙ্গে তখন থেকেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধ। ২০০ বছর পরে পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে স্বাধীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে বিরোধ, মুর্শিদাবাদের নবাবের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধও প্রায় একই চরিত্রের। পার্থক্য এই যে, বাংলার তখনকার সেনা দলের একাংশ, নব্য পুঁজিপতিদের একাংশ এবং সামন্তবাদী শক্তি (ঘসেটি বেগম ও ইয়ার লতিফের নেতৃত্ব) ক্লাইভের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে বাংলার স্বাধীনতা ধ্বংস করেছিল। সেই ষড়যন্ত্র একুশ শতকে পাকিয়ে বাংলাদেশের নব্য পুঁজিপতি, সুশীল সমাজ, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, ব্যাংক ব্যবসায়ী ড. ইউনূসের মাধ্যমে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের আশীর্বাদ লাভ করেও হাসিনা সরকারকে উত্খাত করতে পারেনি।
নবাবের বিনা অনুমতিতে ইংরেজ সৈন্যরা কলকাতায় উইলিয়ম ফোর্ট নামে দুর্গ তৈরি করতে আরম্ভ করলে সিরাজউদ্দৌলা সসৈন্যে কলকাতা আক্রমণ করেন এবং দুর্গ ভেঙে দেন। পরাজিত ক্লাইভ নৌকায় চড়ে তার সৈন্যবাহিনীসহ মাদ্রাজে পালিয়ে যান। পরে মীরজাফরদের উত্সাহে ও আনুকূল্যে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন এবং গভীর ষড়যন্ত্র দ্বারা পালাশীর যুদ্ধে জয়ী হয়ে বন্দি নবাবকে হত্যা করে সুবে বাংলায় কোম্পানি শাসনের সূচনা করেন।
অনেক ঐতিহাসিক বলেছেন, বাংলাদেশে নবাবি যুগের অবসান একদিক থেকে মঙ্গলজনক হয়েছে। দেশটিতে সামন্তবাদের অবসান ঘটে। আধুনিক যুগের উদ্বোধন হয়। রেলপথ তৈরি হয়, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হয়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। কার্ল মার্কস এবং বঙ্কিম চন্দ্রও এই ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু আধুনিক অনেক ইতিহাসবিদ এই ধারণা পোষণ করেন না। তারা বাংলাদেশে নবাবি আমলের শেষ যুগ সম্পর্কে গবেষণা করে বিস্ময়কর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তারা বলেছেন, সিরাজউদ্দৌলা একুশ-বাইশ বছরের যুবক হলেও আলিবর্দী তাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করার জন্য শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছিলেন। ইংরেজ ক্লাইভ ও ফরাসি সেনাপতির সঙ্গে তার আলাপ-আলোচনাতেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
সিরাজউদ্দৌলা ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন, শিল্পোদ্যোগে মন দেন। সেই আমলে পাট, তুলা, রেশম, গরম মসলা (তেজপাতা, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচি ইত্যাদি) ইউরোপে রপ্তানি শুরু হয়। মসলিন কাপড়ের দারুণ চাহিদা ছিল ইউরোপে। তার কাছে ব্রিটেনের ল্যাঙ্কশায়ারের বস্ত্রশিল্প মার খেত। এজন্যই ইংরেজরা সুবে বাংলা দখল করার পর ৯০ হাজার মসলিন তৈরিকারক তাঁতির আঙুল কেটে দিয়েছিল, যাতে মসলিন বস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং ল্যাঙ্কশায়ারের বস্ত্রশিল্প মসলিনের কাছে মার না খায়। সিরাজউদ্দৌলা দেশে ইংরেজ বণিকদের অত্যাচার ও বিনা শুল্কে বাণিজ্য বন্ধ করে বহির্বাণিজ্য এতটাই সম্প্রসারিত করেছিলেন যে অনেক আধুনিক পশ্চিমা গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মতে, সুবে বাংলা তখন এক শিল্পবিপ্লবের দিকে এগিয়ে চলেছিল।
সেই প্রাচীন কালে ইংরেজি বা কোনো পশ্চিমা ভাষা না শিখে বা তাদের সংস্পর্শে না এসে জাপান যদি বিশ শতকের গোড়াতেই শিল্পোন্নত জাতিতে পরিণত হতে পারে, তাহলে নবাবি আমলের বাংলাদেশেরও তা না পারার কথা ছিল না। বাংলাদেশে ইংরেজরা সামন্তবাদ ধ্বংস করেনি, বরং কর্নওয়ালিস ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ দ্বারা অবিভক্ত বাংলায় একটি জমিদার বা সামন্ত শ্রেণি তৈরি করে দেশটির আরো সর্বনাশ করেন। বাংলায় সামন্তবাদ স্থায়ী করেন। কার্ল মার্কসও তার ‘ইন্ডিয়া’ সংক্রান্ত বইতে এ কথা স্বীকার করেছেন।
বাংলায় রেললাইন প্রতিষ্ঠা দ্বারা যোগাযোগব্যবস্থা উন্নতি করার চাইতে ইংরেজ শাসকদের দেশটির সমস্ত সম্পদ দ্রুত লুট করে বিলাতে পাঠানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এই নিষ্ঠুর শোষণের কারণে সোনার বাংলা শ্মশানে পরিণত হয়। বাংলা ১২৭৬ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলা ১৩৫০ সালে ইংরেজ শাসকেরা আরেকটি দুর্ভিক্ষ ঘটায়। তাতে মৃত্যু হয় ৫০ লাখ লোকের। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের পরামর্শমতো এই দুর্ভিক্ষ ঘটানো হয়েছিল। অনেক ইতিহাসবিদ এখন স্বীকার করেন, আঠারো শতকে উদীয়মান পুঁজিবাদী, সামরিক ও সামন্ত শ্রেণির একাংশের বিশ্বাসঘাতকতায় যদি নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন না হতো, তাহলে আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবিভক্ত বাংলাদেশ হতো একটি আধুনিক শক্তিশালী রাষ্ট্র।
পরবর্তীকালে এই রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন হাশেম-সোহরাওয়ার্দী ও শরত্ বসু মিলে তাদের স্বাধীন যুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার মধ্যে। সেই পরিকল্পনা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতৃত্বের চক্রান্তে ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খণ্ড বাংলা নিয়েই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও অসাস্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। তাকেও দেশি-বিদেশি চক্রান্তে সিরাজের মতো আত্মাহুতি দিতে হয়। এখন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলা নতুন করে জেগে উঠেছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও নবাব সিরাজের আমলের মীরজাফর ও জগেশঠদের অনুসারীদের চক্রান্ত অব্যাহত রয়েছে। শেখ হাসিনা যুদ্ধরত।
সেই ইংরেজ আমলে আমাদের ছেলেবেলায় বাংলার স্কুল-কলেজে ৩ জুলাই পালিত হতো। সিরাজউদ্দৌলাকে স্মরণ করে নানা সভা, অনুষ্ঠান হতো। পাকিস্তান আমলে এই দিবস গুরুত্ব হারায়। কারণ অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে পাকিস্তানি শাসকেরা ভয় করতেন। এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলায় অতীতের বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে স্মরণ করা উচিত। ৩ জুলাই প্রতি বছর পালিত হওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মের বাঙালির কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরা উচিত।
[লন্ডন, ৩ জুলাই, শুক্রবার, ২০২০]
