স.ম. শামসুল আলম
বাংলা কথাসাহিত্যকে যারা সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের অন্যতম একজন মকবুলা মনজুর। গত শুক্রবার বিকালে তিনি চলে গেলেন অনন্তশয়নে। তার তিরোধানে আমরা ব্যথিত, শোকাহত। মকবুলা মনজুর সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে ‘ডানপিটে ছেলে’র কথা। ১৯৮০ সালে মুক্তি পায় শিশুতোষ চলচ্চিত্র ডানপিটে ছেলে। আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। এই চলচ্চিত্রটি দেখে চোখের পানি সংবরণ করা সম্ভব হয়নি। সত্যি বলতে কী, সে সময়ে আমি কাহিনিকার বা পরিচালক সম্পর্কে অতটা সচেতন ছিলাম না। শুধু সিনেমার গল্পটা ভালো লাগলেই তৃপ্ত হতাম। তৃপ্তি পাওয়ার মতো একটি অসাধারণ সিনেমা ডানপিটে ছেলে। পরে জেনেছি, মকবুলা মনজুরের কাহিনি থেকে চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন খান আতাউর রহমান। অনেক দাপুটে অভিনেতা, পরিচালক, গীতিকার—নানাভাবে বিখ্যাত খান আতা নির্মিত এই ছবিটি প্রাণস্পর্শ করেছে দর্শকদের। সেটা সম্ভব হয়েছে কাহিনির কারণেই। সেই ডানপিটে ছেলের প্রধান চরিত্রটি ছিল ডাকু সেই ডাকুকে কুকুরে কামড়ানোর পর যে ভয়াবহ দৃশ্যের অবতারণা হয়, সেটা মনে পড়লে এখনো চোখে জল চলে আসে।
মকবুলা মনপুর সাহিত্য, সাংস্কৃৃতিক ও সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সাপ্তাহিক বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগমের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় ছিল এবং তিনি এই পত্রিকার ফিচার সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ ২৫ বছর কাজ করেছেন। দৈনিক আজাদেও ফিচার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লেখিকা সংঘের উপদেষ্টা ছিলেন। জড়িত ছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান প্রতিষ্ঠিত মুকুল ফৌজের সঙ্গে। তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ব্যাংকার হিসেবে। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রিয় পেশা শিক্ষকতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। শিক্ষক হতে একটি মজার ঘটনাও আছে। অর্ধেক বেতনে যোগ দিয়েছিলেন হলিক্রস উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিদ্যালয়ের মাঠে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে গেলে একজন শিক্ষক বাধা দেন। সেই বাধা উপেক্ষা করে তিনি পতাকা উত্তোলন করে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি ইউনিভার্সিটি উইমেন্স কলেজ ও সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন।
মকবুলা মনজুর লেখালেখি শুরু করেন আট বছর বয়স থেকে। তখন তিনি ছড়া-কবিতা লিখতেন। ১৮ বছর বয়স থেকে গদ্যসাহিত্যে ঝুঁকে পড়েন। মকবুলা মনজুর লেখালেখিতে আত্মনিয়োগের পর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। প্রথম বই ‘আর এক জীবন’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—কালের মন্দিরা, অবসন্ন গান, আত্মজা ও আমরা, প্রেম এক সোনালী নদী, ছায়াপথে দেখা, সায়াহ্ন যূথিকা, জল রং ছবি, শিয়রে নিয়ত সূর্য, অচেনা নক্ষত্র, নক্ষত্রের তলে, বৈশাখে শীর্ণ নদী, পতিত পৃথিবী, কনে দেখা আলো, নদীতে অন্ধকার, বাউল বাতাস, লীলা কমল, একটাই জীবন প্রভৃতি।
মকবুলা মনজুর তার লেখার স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। এসব পুরস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০০৫), অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (২০০৭), জাতীয় আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার শ্রেষ্ঠগ্রন্থ পুরস্কার (১৯৯৭), বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৮৪), রাজশাহী লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৩), কমর মুশতারী পুরস্কার (১৯৯০) প্রভৃতি।
মকবুলা মনজুরের কাজের তুলনায় প্রাপ্তি একবারেই সামান্য। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্লোভ, নিরহংকার একজন মানুষ। কখনো কোনো প্রাপ্তির আশা করেননি। চলার পথের সব বেদনাকে তিনি আনন্দে পরিণত করে নিজেকে অনেক উচ্চতায় রেখেছিলেন। এই উচ্চতাকে কোনো দিন নুয়ে পড়তে দেননি। এককালের প্রতিষ্ঠিত সওগাত প্রেস তার জন্য কাঁদবে, এককালের বিখ্যাত বেগম পত্রিকা তার জন্য কাঁদবে, পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ডানপিটে ছেলে তার জন্য কাঁদবে, কালের মন্দিরা তার জন্য কাঁদবে। তিনি শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই শিক্ষকতা পেশা তার জন্য কাঁদবে। তার জন্য কাঁদার অনেকেই আছে। যেমন আমি আজ কাঁদছি। এই সব কান্নার জল একটু হলেও শান্তি পাবে, যদি মকবুলা মনজুর মরণোত্তর একুশে পদক পান বা স্বাধীনতা পুরস্কার পান। বায়ান্নতে, তিনি সেদিন সাহস করে স্কুলের গেট ভেঙে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। একাত্তরে, তিনি সেদিন সাহস করে একটি পতাকা তুলেছিলেন।
n লেখক : কবি, শিশুসাহিত্যিক ও শিশু সংগঠক
