মোছা. ফাতিমাতুজ্জোহরা
আমাদের দেশে যে কোনো বড় বড় উত্সবে রাজধানীর মেট্রো শপিংমল, নিউমার্কেট এবং দেশের বিভিন্ন স্থানের বড় বড় শপিংমলে দেশীয় পণ্যের চাইতে বিদেশি পণ্যেরই বেশি সমাহার দেখা যায়। যেমন—ভারতীয়, পাকিস্তানি সালোয়ার কামিজ, শাড়ি ইত্যাদি। আবার পুরুষদের পোশাকের তালিকাতেও ঠাঁই করে নিচ্ছে থাইল্যান্ড, জাপান ও চীনের পণ্য। এসব উত্সবে ব্যবসাও হয় শত কোটি টাকার। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা বাজারে গিয়ে কতজন দেশীয় পণ্য কিনি?
বরং আমাদের ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজার পেস্ট থেকে শুরু করে, হাতের মোবাইল সেট, টিভি, ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনার এমনকি আমাদের গায়ের পোশাকগুলোও পর্যন্ত বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা। এমনকি অবাক হতে হয়, বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ-তরুণীরা হলিউড, বলিউড, ইন্ডিয়ান সিরিয়াল ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারেন না। আমাদের দেশের সংস্কৃতিটুকু পর্যন্ত বিদেশি সংস্কৃতি দখল করে নিয়েছে। আর সেইসব সিরিয়ালের নায়ক, নায়িকাদের নাম করে দেশের বাজার-ব্যবসা খাত পর্যন্ত ওরা দখলে নিয়ে নিয়েছে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশীয় কোষাগারে। আর আমরা কি না বসে বসে শিল্পায়নের কথা ভাবছি। চিন্তা করা যায়?
তবে আমরা বেশির ভাগই অভিযোগ করে থাকি যে, দেশি পণ্যের মান ভালো না। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আমরা যদি দেশীয় পণ্য না কিনি তাহলে মালিক পণ্যের মান বাড়ানোর সুযোগ পাবে কি করে? বা সেই আর্থিক সামর্থ্যটাই হবে কি করে? যার ফলে মালিক আমাদেরকে কম দামে ভালো মানসম্পন্ন পণ্য দিবেন? আবার ধরুন মালিক যদি শ্রমিকদের ভালো বেতন দিতে না পারেন, তাহলে তিনি কীভাবে পণ্যের মান বৃদ্ধির দিকে নজর দিবেন? আর এই সুযোগটাই আমরা বোকামো করে বিদেশি কোম্পানির মালিকদের দিয়ে দিচ্ছি, ফলে তারা বিখ্যাত হচ্ছে, বাজারে জায়গা দখল করছে, ফলে তারা পণ্যের মান বাড়াতেও সুযোগ পাচ্ছে। আর আমাদের কাছে বাজার দখল করছে পাখি ড্রেস, ইন্ডিয়ান শাড়ি, পাকিস্তানি শাড়ি, পাঞ্জাবি, চাইনিস ইলেকট্রনিকস পণ্য ইত্যাদি। আর সেইজন্য দেশীয় পণ্যের মালিকরা হচ্ছে দেউলিয়া, দেশি পণ্য হারাচ্ছে বাজার। আর এগুলো হচ্ছে আমাদেরই অসচেতনতার কারণে।
অপরপক্ষে,আমরা যারা পোশাক শিল্পে দেশি পণ্যের মান ভালো না বলছি, তাদের জন্য সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে একক দেশ হিসেবে দ্বিতীয়। এমন কি যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংগঠন ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল বলছে, ‘তৈরি পোশাক শিল্পে বিশ্বের প্রথম সারির ১০টি উন্নতমানের (পরিবেশবান্ধব) কারখানার সাতটিই রয়েছে বাংলাদেশে।’
একই মান নিয়ে আমরা বিদেশে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় হই। আর আমাদের নিজ দেশের বাজারগুলো দখল করে রাখে, ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানি টিভি সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাদের পোশাক। বিষয়টা আমাদের কাছে খুবই লজ্জাজনক। এখন প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এইভাবে যদি দেশীয় পণ্যগুলো বাজার হারাতে থাকে তাহলে দেশের অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা যে আরো চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে তা সহজেই অনুমেয়।
আবার এতকিছুর সংকটের মধ্যেও গত মার্চ মাসের দিকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে হানা দিয়েছে মহামারি করোনা ভাইরাস। এই মহামারির কারণে একদিকে তো বিশ্ব বাজারে মন্দা চলছেই। সেই সঙ্গে আমরাও যদি দেশি পণ্য ব্যবহার করে নিজেদের চাহিদা না মেটাই,তবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো ভয়াবহ আর্থিক সংকটের দিকে যাবে। আর আমরা যদি সামনে এবারের ঈদে দেশি পণ্য কিনে নিজেদের চাহিদা মেটাই, তাহলে সে টাকাটা কী হবে? সে টাকাটা দেশেই থেকে যাবে। দেশের মালিক, শ্রমিকরা পাবে। দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল হবে, দেশের মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, দেশের মানুষ ভালো থাকবে আমরা ভালো থাকব অপর দিকে আমরা যদি বিদেশি পণ্য কিনি তাহলে সে টাকাটা কোথায় যাবে? সে টাকাটা খুব সহজেই বিদেশে চলে যাবে। বিদেশি কোম্পানিগুলো আরো বিখ্যাত হবে, আমাদের বাজার আরো দখল করবে। দেশের অর্থনীতির একটা বড় অংশ বাইরে হারিয়ে যাবে।
তাই আসুন নিজেকে বাঁচাতে, নিজের দেশকে বাঁচাতেই এবারের ঈদে দেশি পণ্য ক্রয়ের চেষ্টা করি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
