এম এ আলআমিন
করোনা মহামারির জন্য সিরিয়া এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম দখল করছে না। আসাদ পরিবারের চার দশকের একচ্ছত্র শাসনের বিরুদ্ধে ৯ বছর আগে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ এখন প্রায় শেষের দিকে। বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত বিরোধী গ্রুপগুলো শেষ পর্যন্ত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে পেরে উঠতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট বিদেশি পক্ষগুলোর মধ্যেও ছিল বিস্তর মতপার্থক্য। ধারণা করা হয়েছিল শাসক বাশার আল আসাদই হয়তো শেষ হাসি হাসবেন। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আসাদ সরকারের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক। ১০০ বছর আগে সিরিয়া ছিল ফরাসি উপনিবেশ। আলী সুলায়মানিয়া আলওয়াহহিশ নামে এক বিপ্লবী ১৯২০-এর দশকে ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ‘আল আসাদ’ (সিংহ) খেতাব অর্জন করেন। তার সন্তানসন্ততি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে তারই বংশধরের একজন হাফিজ আল আসাদ ১৯৭০-এর দশকের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিরিয়ায় ক্ষমতায় এলো শিয়ারা। উল্লেখ্য, আসাদ পরিবার আলাভি গোষ্ঠীভুক্ত শিয়া। ক্ষুদ্র এই শিয়া গ্রুপটি ইতিপূর্বে ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল।
সিরিয়ায় এখন যে ভয়াবহ গোষ্ঠী সংঘাত চলছে ৮০ এর দশকে প্রথম এরকম দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়েছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদের জ্ঞাতিভাই রিফাত আল আসাদ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাকে সাময়িকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করেন। হাফিজ আল আসাদ দ্রুত অভ্যুত্থান নস্যাত করে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেন। তিনি একই সঙ্গে ছেলে বাশারকে বিদ্রোহ কীভাবে দমন করতে হয় তা শিক্ষা দেন। বাশার ভালোভাবেই তা রপ্ত করেন। ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর সরকারি বাহিনী বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এটি হলো বাইরের চিত্র। অপরদিকে পরিবারের ভেতর বহুসংখ্যক জ্ঞাতিভাইদের ভয় দেখিয়ে অথবা আর্থিক সুবিধা দিয়ে নিজের বশে রাখেন আসাদ।
মে মাসে ঘটে যায় এক নজীরবিহীন ঘটনা। আসাদ আকস্মিকভাবে তার মাতৃকূলের জ্ঞাতিভাই রামি মাখলুফের ওপর ২৩০ মিলিয়ন ডলার কর ধার্য করেন। মাখলুফ আসাদের জ্ঞাতিভাইদের মধ্যে অন্যতম ধনী হিসেবে পরিচিত। মাখলুফ আনুমানিক ৫ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক। তিনি দেশটির বৃহত্ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি সিরিয়াটেলের স্বত্বাধিকারী। তার সমস্ত আয় এই কোম্পানি থেকে অর্জিত। তিনি আসাদের অনুগত শিয়া মিলিশিয়াদের তহবিল যুগিয়ে থাকেন। এই ঘটনার পর আসাদের ক্ষমতায় থাকার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন তার অনেক জ্ঞাতিভাই। বিশ্লেষকরা মনে করেন এটি একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত। মাখলুফকে খেপিয়ে দিয়ে আসাদ প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছেন। ৯ বছরের গৃহযুদ্ধে বিরোধীরা সুবিধা করতে পারেনি কারণ তাদের মধ্যে ঐক্য ছিল না। আসাদ ক্ষমতায় টিকে যান কেবল তার জ্ঞাতিভাইদের একতাবদ্ধ রাখার কারণেই।
সিরিয়া বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে। গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে ১ সিরীয় পাউন্ড সমান ছিল ৫০ মার্কিন ডলার সেটি ৩ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। জনগণের ৯০ শতাংশ ধুঁকছে আর্থিক দুর্দশায়। এ অবস্থায় মাখলুফের মতো ধনীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি এতদিন কেবল সরকার টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। তবে আসাদের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর মে মাসে তিনি একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। তিনি এতে আসাদকে এই বলে হুঁশিয়ারি দেন যে আলাভি শিয়া ও মিলিশিয়াদের সহযোগিতা তিনি হারাতে পারেন। নিজের আর্থিক সমর্থনপুষ্ট গ্রুপগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে মাখলুফ এই হুমকি দেন। আসাদের পরিবারের মধ্যেই রয়েছে গোষ্ঠী বিভাজন। আসাদের স্ত্রী আসমা এক জন সুন্নি। মাখলুফ আসমাকে উদ্দেশ্য করে আলাভি অর্থ হাতিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। অনেকে মনে করেন মাখলুফ আলাভিদের মধ্যে আসাদের প্রতি আনুগত্য ম্লান করে দেওয়াসহ পরিবারের মধ্যেই তাকে চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারেন।
