যুক্তরাষ্ট্র-ইইউ সম্পর্কে বড় ফাটল!

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২০, ২১:১৩

তালেব রানা

 

বিগত সাত দশকের বেশি সময় ধরে ট্রান্সলান্টিক জোট ইউরোপের স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চালিত পশ্চিমা শৃঙ্খলাও প্রতীয়মান হয়েছে এই সম্পর্কে। কিন্তু ২০২০ সালে এসে মনে হচ্ছে, এই সম্পর্ক নিয়ে আটলান্টিকের দুই কুলই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর সম্পর্কে যে চীর ধরতে শুরু করেছিল তা এখন বড় ফাটলে রূপ নিতে চলেছে।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক বিশেষণমূলক নিবন্ধে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের করা করোনা ভাইরাসের নিরাপদ দেশের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।  যার অর্থ হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপে ঢুকতে পারবেন না মার্কিন পর্যটকরা। কিন্তু বিতর্কিতভাবে পারস্পরিক ব্যবস্থাপনার শর্তে ঐ তালিকায় রাখা হয়েছে চীনকে। যে দেশেই এই ভাইরাসটির উত্পত্তি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইউরোপের মিত্রদের বিভিন্ন সময় তীব্র সমালোচনা করেছেন। হয়তো তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই ইইউর কর্মকর্তারা    জোর দিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয় বরং মহামারির পরিস্থিতির বিচারে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নাম না প্রকাশের শর্তে ইউরোপের কয়েক জন কর্মকর্তা ও কূটনীতিক বলছেন, অতীতে বিভিন্ন সময়, শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে  খুশি করার জন্য চীনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করাই ছিল স্বাভাবিক রীতি।

কিন্তু, ইউরোপিয়ান সম্পর্কের ব্যাপারে আজকাল ওয়াশিংটনের যে খুব একটা আগ্রহ নেই, সেটি এখন কোনো গোপন বিষয় নয়। আর এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরো ব্যাপক পরিসরের কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন ফিরে পাওয়ার পথ খুঁজছে ইউরোপের দেশগুলো। ব্রাসেলস ভাবছে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিজের দূরত্ব তৈরি করতে। যাতে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য তৈরির মাধ্যমে বিশ্বের একটি সুপারপাওয়ারের ওপর নির্ভশীলতা কমাতে পারে ইউরোপ।

বিগত কয়েক বছরে, ট্রাম্প যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে বেশি স্বস্তি পায়নি ইউরোপ। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি, ফাইভ-জির মতো বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও ভূমিকার কারণে ইউরোপ পুরোনো মিত্রের কাছ থেকে আস্তে আস্তে সরে চীনের দিকে ঝুঁকে গেছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের গভীর ও সুপ্রতিষ্ঠিত সম্পর্কের নিরিখে এ কথা এখনই বলা ঠিক হবে না হয়তো। তবে বর্তমানে বেইজিংয়ের প্রতি ইউরোপের যে কোনো ধরনের বন্ধুত্ব অনুভব করাটা সেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সত্যিকারের আঘাত হিসেবে পরিগণিত হবে।

নাম না প্রকাশের শর্তে ইউরোপের এক কূটনীতিক বলেন, ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও প্রেক্ষাপটে ইউরোপের এই সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়েই শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময়কালে তা দ্রুত এগিয়েছে। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর নজর রাখছেন এমন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চার বছরে এই সম্পর্ক চাপের মুখে পড়ে গেছে। আগামী নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও জিতে আসেন, তাহলে এ সম্পর্ক আরো খারাপ হবে।

অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ইউরোপিয়ান অ্যান্ড সিকিউরিটি পলিসির ভেলিনা চাকারোভার মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইইউ, বিশেষ করে জার্মানিকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। তাই তিনি দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এলে এ নিয়ে উত্তেজনা আরো বাড়বে।

ইতিমধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায়  ইইউ পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। অন্যদিকে ইউরোপের ন্যাটো সদস্যদের প্রতি আক্রমণ এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিস্তৃতির মাধ্যমে এ ধরনের প্রচেষ্টাকে ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন ট্রাম্প। ইউরোপের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চুক্তি থেকে সরে এসেছেন। জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ন্যাটোতে অর্থ বরাদ্দের ইস্যুতে ইউরোপের নিরাপত্তার গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছেন। যে কারণে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি ইউরোপ এখন ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে।

চাকারোভা মনে করেন, বর্তমান অবস্থায় ইইউর প্রতিষ্ঠানগুলো ও সদস্য রাষ্ট্র  আশা করছেন, নভেম্বরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন পাশ করবেন। তিনি জোটের পক্ষের লোক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক তিনি আবারও শক্তিশালী করবেন বলেই আশা করা হচ্ছে। একজন কূটনীতিক বলেছেন, বৈশ্বিক মহামারির ক্ষেত্রে চীন ও হোয়াইট হাউসের ভূমিকা সবাই দেখেছে। সত্যি বলতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার আগের পৃথিবী আর এখনকার পৃথিবী ভিন্ন। বিশ্বে যখন সত্যিকার অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রয়োজন ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র সবার থেকে বিচ্ছিন্ন।