কথার কামান ছুড়ছে অস্ট্রেলিয়া-চীন

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২০, ২১:৫৩

সালেহউদ্দিন

লাদাখের গালওয়ান ভ্যালিতে ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা এখনো কমেনি। এরই মধ্যে নতুন এক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ও চীনের মধ্যে। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে একে অন্যের বিরুদ্ধে ‘কথার কামান’ ছুড়ছে এই দেশ দুইটি। গত এপ্রিলে করোনা ভাইরাসের উত্স এবং এর বিস্তার সম্পর্কে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানায় অস্ট্রেলিয়া। মার্কিন দপ্তর ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ অস্ট্রলিয়ার এই প্রস্তাব সমর্থন করে। এরপরই শুরু হয় দুইটি দেশের মধ্যে তপ্ত বাগ্যুদ্ধ। এই বাগ্যুদ্ধ ক্রমশ বাণিজ্যযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। একই সঙ্গে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর ও আশেপাশের অঞ্চলে চলছে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি। চীনকে রুখতে দিনকয়েক আগে ২৭০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা নীতি ঘোষণা করেছে অস্ট্রেলিয়া।

অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডটন প্রথম চীনের বিরুদ্ধে গত ১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বরাত দিয়ে বলেন, তারা করোনা ভাইরাসের নির্দিষ্ট পথ বা উত্স ছিল বলে তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে। আমি মনে করি যে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া এবং তথ্য সরবরাহ করা চীনের দায়িত্ব। এর দুই দিন পর অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী মেরিস পেইন করোনা ভাইরাসের উদ্ভব এবং বিস্তার সম্পর্কে তদন্তের আহ্বান জানান। অস্ট্রেলিয়ার এসব প্রতিক্রিয়ার জবাব দেয় চীনের সরকারপন্থি ও উগ্র জাতীয়তাবাদের সমর্থক সংবাদপত্র ‘গ্লোবাল টাইমস’। পত্রিকাটির এক প্রতিবেদন দাবি করা হয়, ‘করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে চীন সর্বদা প্রকাশ্য, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল পদ্ধতিতে কাজ করেছে এবং ধারাবাহিক, সময়োপযোগী ও জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে।’

গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ‘চীনের বিরুদ্ধে প্রচারযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করার জন্য ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কিছু নির্দেশনা পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া। কিছু অস্ট্রেলিয়ান রাজনীতিবিদ চীনের ওপর রাজনৈতিক আক্রমণ চালানোর জন্য মার্কিন বাহিনী যা বলছে তা অনুসরণ করেছে। তাদের এই অজ্ঞতা  এবং গোঁড়ামির পাশাপাশি তাদের স্বাধীনতার অভাবও প্রকাশ করে, যা দুঃখজনক।’ এরপর ২২ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ায় চীনা দূতাবাসের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ‘এটা সর্বজনবিদিত যে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চস্তরের কর্মকর্তাসহ কিছু লোক চীনবিরোধী ‘তথ্য ভাইরাস’ ছড়াচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—চীনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো।’ এর চার দিন পর অস্ট্রেলিয়ায় চীনের রাষ্ট্রদূত চেং জিংয়ে একটি  সংবাদপত্রে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘তদন্তের জন্য অস্ট্রেলিয়ার চাপ বিপজ্জনক, ট্রাম্প প্রশাসনের ইঙ্গিতে রাজনৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ—যা অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আপনারা এখন যা করছেন সে সম্পর্কে চীনা জনগণ হতাশ, হতাশ এবং হতাশ! যদি তাদের মেজাজ খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে যায়, তারা ভাববে—কেন আমরা এমন দেশে যাব যে দেশটি চীনের পক্ষে বন্ধুত্বপূর্ণ নয়?’

পরের দিন ২৭ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য ও পর্যটনমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক হুমকির কারণে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন হতে পারে না। জবরদস্তি বা হুমকির কারণে জনস্বাস্থ্যের ইস্যুতে আমরা আমাদের নীতি ও অবস্থান পরিবর্তন করব না। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী মেরিস পেইন বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবসহ এক অভূতপূর্ব বৈশ্বিক সংকট তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাপী একটি সহযোগিতা প্রয়োজন তখন অর্থনৈতিক হুমকি এবং জবরদস্তিমূলক পরামর্শ আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।’

দুই পক্ষের এই কথার যুদ্ধের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধও শুরু হয়ে গেছে। চীন অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিকৃত বার্লি বা যবের ওপর ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কর বসিয়েছে। যুক্তি হিসেবে দেখিয়েছে, চীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য অস্ট্রেলিয়া নাকি এসব পণ্যের ওপর ভর্তুকি দিয়ে চীনে প্রবেশ করাচ্ছে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া থেকে মাংস আমদানিও স্থগিত করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ৮৮ শতাংশ বার্লি রপ্তানি হয় চীনে। সেইসঙ্গে প্রধান চারটি মাংস ব্যবসায়ী গ্রুপের আমদানি স্থগিত করেছে যাদের ৩৫ শতাংশ মাংস রপ্তানি হতো চীনে।

চীন ও অস্ট্রেলিয়ার এই বিরোধে অস্ট্রলিয়ায় মালটিন্যাশনাল এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি লক্ষ করা গেছে। চীনে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত ছিলেন ড. স্টিফেন ফিত্সগেরাল্ড। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক তদন্তের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দাবি আনাড়ি ছিল, যা চীনের সঙ্গে অহেতুক বিভেদ তৈরি করবে। লোই ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. মাইকেল ফুলিলোভ বলেছেন, একটি স্বাধীন তদন্ত চালানোর ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার আহ্বান সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত ছিল। আমি মনে করি, চীনের বিশ্বকে একটা ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।’ তার এই আহ্বানের মাস পার হয়নি, এরইমধ্যে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন কোনো রকম রাখঢাক না করেই চীনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়াকে প্রস্তুত করার ঘোষণা দিয়েছেন। মরিসন বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া চায় এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থাকবে মুক্ত। যেখানে কোনো একটি দেশের আধিপত্য এবং জবরদস্তি চলবে না।’

প্রধানমন্ত্রী মরিসন বলেন, এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রাধান্য বিস্তার নিয়ে চীন এবং আমেরিকার মধ্যে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তার ফলে দিনদিন উত্তেজনা বাড়ছে এবং যে কোনো সময় ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এদিকে ২০২০ সালের প্রতিরক্ষা কৌশলগত আপডেট এবং বাহিনী কাঠামো পরিকল্পনার আওতায় মার্কিন সহযোগী ‘আঞ্চলিক সুরক্ষা বজায় রাখা এবং উত্তর-পূর্ব ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরসহ আশপাশ অঞ্চলের প্রতিরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে। অস্ট্রেলিয়া তাদের নৌবাহিনীর জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে অত্যাধুনিক এজিএম ১৫৮ সি ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কিনবে, যা ৩৭০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম। পাশাপাশি তারা নিজেরই দূরপাল্লার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রকল্প হাতে নেবে, যা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে পারবে। সেইসঙ্গে চালকবিহীন ড্রোন বিমানের সংখ্যা অনেক গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার  প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ঘোষণার আগের দিন সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ নতুন ৫০০ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের পরিকল্পনার ঘোষণা করেছে। প্রতিরক্ষা বাজেট থেকে এই কাজে ১৩৫ কোটি ডলারের জোগান দেওয়া হবে। চীন-মার্কিন এই প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়া যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে সেটাও স্পষ্ট করেছেন মিস্টার মরিসন। কারণ শত শত কোটি ডলার খরচ করে আগামী বছরগুলোতে অত্যাধুনিক অস্ত্রসম্ভার কেনার যে পরিকল্পনা তিনি করেছেন, তা আসবে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

বামপন্থি বিশ্লেষকরা মনে করেন, উত্তেজনা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র কেনার এটি একটি অস্ট্রেলিয়ার ফন্দি। ভিন্নমত পোষণ করে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান স্টাডি সেন্টারের পরিচালক এবং প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অধ্যাপক অ্যাশলে টাউনসেন্ড ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানে লিখেছেন, অস্ট্রেলিয়ার প্রধান লক্ষ্য হলো, সংকট তৈরি হলে তারা যেন চীনা সেনাবাহিনী, চীনা স্বার্থ এবং অবকাঠামোতে আঘাত করতে পারে। তবে পরিসংখ্যান বলছে—এই দশকের মাঝামাঝি পর্যায়ে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তির গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের বিনিয়োগ একত্র করলে যা হবে, চীনের একার বিনিয়োগ তা ছাড়িয়ে যাবে। সুতরাং এই বাস্তবতায় উদ্বিগ্ন অস্ট্রেলিয়া।

n লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক