অনিক আহমেদ
করোনা ভাইরাসের প্রকোপে পৃথিবী এখন বিপর্যস্ত। অন্যান্য দেশের মতো ভালো নেই প্রিয় বাংলাদেশও। আক্রান্তের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। করোনা মহামারির এ দুঃসময়ে সংবাদপত্রের পাতা জুড়ে যেমন মানবিকতার বিভিন্ন গল্প পড়ছি, সঙ্গে পড়ছি কিছু অমানবিকতার গল্পও। বকেয়া ভাড়া পরিশোধে গড়িমসি করায় মেসের ছাত্রদের সনদপত্র ফেলে দেওয়ার একটি খবর বেশ মন খারাপ করিয়ে দিয়েছে। রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার মেসটিতে ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় ৫০ ছাত্রের শিক্ষাসনদ, আসবাবপত্রসহ সবকিছুই ফেলে দেওয়া হয়েছে। কলাবাগানেও বাসাভাড়া পরিশোধে দেরি করায় আট ছাত্রের ল্যাপটপ, আসবাবপত্র ও শিক্ষাসনদ ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার একটি খবরও দেখতে পেয়েছি একই দিনে? টেলিভিশনের পর্দায় ‘সজীব’ নামের এক ছাত্রের কান্না হূদয় ছুঁয়ে গেছে সবার। মেসের শিক্ষার্থীদের প্রতি এমন অমানবিক আচরণের খবর শুধু ঢাকা থেকে নয়, এমন খবর দেখতে পাচ্ছি রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনাসহ দেশের সমস্ত অঞ্চল থেকেই। খবরের কাগজে নিয়মিত চোখ বুলানোর সুবাদে এর বিপরীত ঘটনাগুলো চোখের আড়াল হয়নি। করোনার এ দুর্যোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেস কিংবা বাসার মালিকদের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য ঘোষণা এসেছে ভাড়া মওকুফসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার। কিছু জেলায় মেসের ভাড়া শতাংশের হিসাবে ছাড় দেওয়ার খবরও আমরা দেখেছি। মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করা এই খবরগুলো মনে আনন্দের সৃষ্টি করে। এমন মানবিক বাংলাদেশই তো আমরা সব সময় চেয়ে এসেছি।
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবাসিক সুবিধা অপ্রতুল। ফলে অধিকাংশকেই থাকার জন্য বেছে নিতে হয় মেস অথবা বাসা। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের খুঁজে নিতে হয় টিউশনিসহ অন্যান্য জীবিকার পথ। নিজস্ব আয়ের টাকাতেই পরিশোধ করতে হয় মেস অথবা বাসাভাড়া? পাশাপাশি খরচ চালিয়ে নিতে হয় পড়াশোনার। করোনা মহামারির প্রভাবে গ্রামে ফিরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার্থীদের জন্য এসব আয়ের উত্স বন্ধ হয়ে গেছে| উপরন্তু মহামারির প্রভাবে জীবিকা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে অনেকের পরিবার। কেউ নিজে হচ্ছে করোনা আক্রান্ত, কারো হয়তো পরিবারের কেউ আক্রান্ত? ফলে সময়মতো ভাড়া পরিশোধ করা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন অর্থনৈতিক, সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বকেয়ার দাবিতে সনদ ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার মতো অমানবিক আচরণ শিক্ষার্থীদের মানসে অসীম চাপের সৃষ্টি করছে।
শিক্ষার্থীরা জাতির ভবিষ্যত্। দেশ ও জাতির ভবিষ্যত্ কর্ণধার। মহামারির এ সময়ে গ্রাম-শহরনির্বিশেষে তাদেরকে আমরা দেখেছি অনুদান সংগ্রহ করে ত্রাণসহায়তা কার্যক্রম চালাতে। করোনার চিকিত্সায় ব্যবহূত প্লাজমা দানেও শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসেছে। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে চিকিত্সক, প্রকৌশলী, বিচারকসহ নানান পেশায় জড়িত হবে। অলংকৃত করবে সচিবালয় ও মন্ত্রণালয়ের আসন।
মেস ও বাসাভাড়া নিয়ে এ ধরনের দুর্ভোগ কারোরই কাম্য নয়। এ সমস্যার আশু সমাধানে সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হব। মেস মালিক এবং শিক্ষার্থী—উভয় পক্ষের মধ্যে দূরত্ব নিরসনের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে যৌক্তিক মাত্রায় মেসের ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মেসের ভাড়া দিতে সহায়তা করতে হবে। কিছু দরিদ্র মেস মালিকেরও একমাত্র আয়ের উত্স মেসের ভাড়া। এসব মালিক চিহ্নিত করে আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। ‘বাড়িভাড়া আইন, ১৯৯১’ কার্যকরে ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
বৈশ্বিক এ দুর্যোগে আমাদের ধৈর্যশীল হতে হবে, সহনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসতে হবে। করোনার অজুহাতে নিজের মাকে জঙ্গলে ফেলে যাওয়ার খবর আমরা আর দেখতে চাই না। বকেয়া ভাড়ার দাবিতে শিক্ষাসনদ ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার মতো অমানবিকতার গল্পও আমরা আর দেখতে চাই না। আসুন না মহামারির শিক্ষা নিয়ে আমরা গড়ে তুলি ‘মানবিক বাংলাদেশ’।
লেখক :শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
