কাব্য সাহা
প্রায় সময় খবরের বড় হেডলাইনে চোখে পড়ে নৌকা, ট্রলার বা লঞ্চ দুর্ঘটনার মতো মর্মান্তিক খবর। যার ফলশ্রুতিতে লাশ হতে হয় বিভিন্ন বয়সের মানুষকে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শ্যামবাজারে লঞ্চডুবিতে প্রাণ হারানো মুন্সীগঞ্জের এক ঝালমুড়ি বিক্রেতা। তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে কিছুদিন আগে, তার সন্তানের একমাত্র শেষ সম্বল বাবাও হারিয়ে গেলেন। আর কত দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে সবাই সচেতন হবে? আর কত লাশ হলে মুনাফা লোভীরা সতর্কতা অবলম্বন করবে? কে নেবে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার দায়?
টাকার জন্য একটি নৌযানে ধারণক্ষমতার তিন গুণ লোক উঠানো, যান্ত্রিক ত্রুটির তোয়াক্কা না করে অল্প টাকায় অদক্ষ চালককে বসিয়ে দেওয়া—এগুলো কবে ঠিক হবে? আর এগুলোর জন্য আমরা শুধু সিস্টেমকেই দায়ী করব? আমাদের এই জায়গা থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যা জীবনের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করবে। প্রথমেই মালিক, চালক এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে মানবিকতার সঙ্গে এসব নৈরাজ্য বন্ধে কঠোর হতে হবে। কিছু বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করলে এর দিকগুলো ফলপ্রসূ হবে। যেমন-
১) নৌযান চলাচলের পূর্বমুহূর্তে নৌযানের যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করে দেখতে হবে ঠিক আছে কিনা! ২) ধারণক্ষমতা বিবেচনা করে নৌযানের সামনে বড় নোটিশ টানিয়ে দিতে হবে। ৩) ধারণক্ষমতা অনুযায়ী লোক বিবেচনায় রেখে মানসম্পন্ন লাইফ জ্যাকেট রাখতে হবে। ৪) নৌযান চালকের দক্ষতা এবং শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে বা কোনো সমস্যা থাকলে যাত্রার পূর্বমুহূর্তে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। ৫) নৌ-নিরাপত্তায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সবাইকে এসব প্রতিদিন নজরদারিতে রাখতে হবে। ৬) নৌযানের যাত্রীসহ নৌযান পরিচালনায় দায়িত্বরত সবাইকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বাধ্যতামূলক লাইফ জ্যাকেট পরিধান করতে হবে। ৬) নৌ-নিরাপত্তায় নিয়োজিতদের নৌ-টহল বাড়াতে হবে। ৭) নিয়ম ভঙ্গ করলে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রাখতে হবে। ৮) নৌ ব্যবস্থায় জরুরিসেবা বা অভিযোগকেন্দ্র চালু করতে হবে। ৯) যাত্রীদের সচেতনতার সঙ্গে নৌযানে যাতায়াত করতে হবে। অসংগতিপূর্ণ কিছু মনে হলে জরুরিসেবায় যোগাযোগ করতে হবে। ১০) সেবার মানসিকতা সবার মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। কোনো অসুস্থ প্রতিযোগিতা বা বেশি মুনাফালোভী এমন চিন্তা পরিবর্তন করতে হবে।
আমরা সবাই যদি সতর্ক না হই তাহলে কারো একার পক্ষে পরিবর্তন আনা হয় তো কখনো সম্ভব হবে না। একজন নৌযান চালকে মনে রাখতে হবে, তার হাতে অসংখ্য যাত্রীর প্রাণ, তাদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তার ওপর নির্ভর করছে। মালিকদের বিবেচনা করতে হবে যেই নৌযানে মানুষ চলাচল করছে তাদের সবাই কোনো না কোনো পরিবারের প্রিয়জন। তাই অসংগতিপূর্ণ কিছু থাকলে সময় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। সর্বোপরি সব যাত্রীর নিজেদের নিরাপত্তা মাথায় রেখে ভ্রমণ নিরাপদ হয় সেভাবে সহযোগিতা করতে হবে। এর জন্য সবার আন্তরিকতা খুব প্রয়োজন। যার ফলে কমে যাবে হয় তো এই লাশের খেলা, মৃত্যু ঝুঁকি। থেমে যাবে পরিবারের অসহায় মানুষের আর্তনাদ। সবাইকে নিয়ম জানতে হবে, মানতে হবে। আত্মসচেতনতা শুধু নিজেকেই নয়, পরিবার এবং দেশের জন্যও কল্যাণকর।
লেখক :শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
