সৈয়দ আশরাফ আর নেই

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:৫৭

বর্ষীয়ান রাজনীতিক, আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (৬৭) আর নেই। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টায় থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি....রাজিউন)। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন তিনি।

মুজিব নগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ পুত্র গণমানুষের নেতা সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।   ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে  সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বড় অবদান ছিল।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

অসুস্থতার কারণে তিনি গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সংসদ থেকে ছুটি নেন। দেশে না থেকেও সৈয়দ আশরাফ কিশোরগঞ্জ-১ (কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর উপজেলা) আসনে সদ্য অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে জয়ী হন।

গত ছয় মাস বাবার সেবা করতে গিয়ে চাকরি ছেড়ে দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফের একমাত্র মেয়ে। আশরাফের ছোট ভাই, দুই বোন ও মেয়ে মরদেহের সঙ্গে আছেন। আগামীকাল শনিবার বিকালে তার মরদেহ দেশে আনা হবে।

গত বছরের অক্টোবরে তার স্ত্রী শিলা ইসলাম মারা যান। মৃত্যুকালে সৈয়দ আশরাফ এক মেয়ে, ভাই-বোনসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার শোক বার্তায় বলেন, সৈয়দ আশরাফের মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় ক্ষতি। গণতন্ত্র, রাজনীতি ও সমাজ উন্নয়নে তার অবদান মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। রাষ্ট্রপতি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মত রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে দেশ ও জাতি শোকে মুহ্যমান। তিনি ছিলেন পুরোদস্তর সত্ ব্যক্তিত্ব, দক্ষ সংগঠক ও গণমানুষের নেতা। প্রধানমন্ত্রী ১/১১-এর দুঃসময়ে তার বলিষ্ঠ ভূমিকার কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি আরো বলেন, মানুষের হূদয়ে এই জননেতা চিরদিন তার কীর্তির মাধ্যমে বেঁচে থাকবেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীও পৃথক শোক বার্তায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তার মতো সজ্জন, ত্যাগী,  বিচক্ষণ ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদের শূন্যতা কখনোই পূরণ হবার নয়। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সৈয়দ আশরাফের অবদান স্মরণ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এছাড়া শোক প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

জেপি’র শোক প্রকাশ

জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান ও পানি সম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে জেপি’র নেতৃদ্বয় বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। অপর এক বিবৃতিতে জাতীয় যুব সংহতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল ও সাধারণ সম্পাদক মাফুজ আলম শোক প্রকাশ করেছেন।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৈয়দ আশরাফের জন্য ভোট চেয়েছিলেন কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে। তিনি জেলার নেতাদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে বলেছিলেন, ‘যেহেতু এখানে সৈয়দ আশরাফ সাহেব অসুস্থ, সবাই মিলে তার জন্য কাজ করে যাবেন, যেন তিনি নির্বাচনে জয়ী হন। সুস্থ হয়ে তিনি যেন আমাদের মাঝে ফিরে আসেন এই দোয়া করছি।’

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফ ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে শেখ হাসিনা গ্রেফতার হওয়ার পর দলের হাল ধরেন। দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। ওই বিশ্বস্ততার পুরস্কার হিসেবে পরে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৭ সালে স্ত্রী শীলা আহমেদের মৃত্যুর পর থেকে নিজেও অসুস্থ ছিলেন আশরাফ। একমাত্র মেয়ের সঙ্গে লন্ডনেই বেশি সময় কাটাতেন।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। তিনি ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারিতে ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এমএ ডিগ্রির অধিকারী আশরাফ পেশায় একজন ব্যবসায়ী। পারিবারিক ঐতিহ্যের সূত্র ধরে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে পিতা  সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তিনি যুক্তরাজ্য চলে যান। প্রবাস জীবনে তিনি যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে বরাবরই শেখ হাসিনার পাশে ছিলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে আসেন এবং কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে সংসদ থেকে ৯০ দিনের জন্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছুটি নিয়েছিলেন। ব্যাংককের হাসপাতালে থেকেই করা ওই আবেদনে আশরাফ বলেছিলেন, তিনি ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন ইউনিটে’ ভর্তি রয়েছেন। তার চিকিত্সায় আরও অনেকদিন সময় লাগবে। দেশবাসী তার সুস্থ হয়ে ফেরার প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে থাকেন। কিন্তু এরই মধ্যে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন পাঁচবারের  এই সংসদ সদস্য। 

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ শোক জানিয়েছেন। এছাড়া জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমপি এবং চীফ হুইপ আ.স.ম ফিরোজ এমপি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন এলজিআরডি মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহাঃ ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল এবং তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মোঃ মশিউর রহমান রাঙ্গাঁ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি প্রমুখ।