‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ’

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২০, ২১:২৪

তিনিই আমেরিকাকে চিনাইয়াছিলেন ইউরোপ তথা সমগ্র বিশ্বের নিকট। উহা ছিল ১২ অক্টোবর ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ। সেই কথিত ‘মহান আবিষ্কারক’-এর মূর্তি এখন উত্পাটন করা হইতেছে সমূলে। সেই দুঃসাহসী অভিযাত্রী ‘ক্রিস্টোফার কলম্বাস’কে বলা হইতেছে গণহত্যার প্রতীক! সম্প্রতি একই দিনে আমেরিকার দুইটি শহর হইতে কলম্বাসের মূর্তির মাথা ভাঙা হইয়াছে। কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার পর আমেরিকা জুড়িয়াই বিক্ষোভ চলিতেছে যে, কালোদের জীবনেরও মূল্য রহিয়াছে। সেই ক্ষোভ আছড়াইয়া পড়িতেছে কলম্বাসের মূর্তির উপর। ভার্জিনিয়ায় মূর্তির মাথা ভাঙিয়া বিক্ষোভকারীরা তাহাতে আগুন ধরাইয়া দেন। তাহার পর মূর্তিটি একটি জলাশয়ে ফেলিয়া দেওয়া হয়। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের রিচমন্ডে ১৮৯১ সালে স্থাপন করা জেনারেল উইলিয়াম কার্টারের মূর্তি, মিশিগানের সাবেক বর্ণবাদী মেয়র অরভিল হুবার্টের মূর্তিসহ বেশকিছু বিতর্কিত ব্যক্তির মূর্তি বিক্ষোভকারীরা ভাঙিয়া ফালাইয়াছে।

মূর্তি ভাঙিবার খেলা এই বিশ্বকে শিখাইয়াছে শ্বেতাঙ্গ পরাশক্তিরাই। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানের চাকায় ভর করিয়া সাদ্দাম হোসেনের বিশাল কালো পাথরের মূর্তি ধ্বংস করা হইয়াছিল ২০১৫ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙিয়া জন্ম নেওয়া দেশগুলিতে একের পর এক ভাঙিয়া ফেলা হইয়াছিল লেনিনের মূর্তি। জার্মানির শহরগুলিতে নািস যুগের কোনো ভাস্কর্য চোখে পড়িবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অধিকাংশ ভাস্কর্যই বোমা মারিয়া ধ্বংস করিয়া দেওয়া হইয়াছে। যাহাদের মস্তিষ্ক হইতে এই ধরনের মূর্তি ভাঙিয়া ফালাইবার খেলা শুরু করা হইয়াছিল, এখন কিনা সেই স্ফুলিঙ্গ তাহাদের ঘরেও প্রবেশ করিয়াছে! ১৪৯২ সালে ইতালীয় নাগরিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করেন তখন হইতেই আমেরিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ এবং স্থানীয় আদিবাসীদের উপর গণহত্যার সূচনা ঘটে। এই জন্য বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হাওয়ার্ড জিন মনে করেন—উহা আবিষ্কার নহে, বরং স্রেফ লুটতরাজ। তাহার মতে, কলম্বাসের ডায়ারির পাতায় পাতায় যেই মানুষটিকে পাওয়া যায়, তিনি এক বর্বর-ধূর্ত-উচ্চাকাঙ্ক্ষী লুটেরা মাত্র। কলম্বাসের সঙ্গীরা এই নূতন ভূখণ্ডে শুধু অস্ত্র নহে, ইহার সহিত লইয়া আসিয়াছিলেন বসন্ত, হাম ইত্যাদি ধরনের বিবিধ নূতন রোগ—যাহার বিরুদ্ধে স্থানীয় আদিবাসীদের ছিল না কোনো প্রতিরোধ। হত্যা, আর রোগে আক্রান্ত হইয়া যখন আদিবাসীদের অবিরাম মৃত্যু হইতেছিল, কলম্বাস তখন তাহার ডায়ারিতে লিখিয়াছেন, ‘ঈশ্বর সহায়, বিক্রয়ের জন্য এইখান হইতে যত খুশি দাস প্রেরণ করা সম্ভব।’ ঐতিহাসিকের মতে, ইউরোপিয়ান ও আফ্রিকান বসতি স্থাপনকারীদের প্রভাবে নূতন বিশ্বের অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ মারা যায়, যাহা কিনা মধ্যযুগীয় ইউরোপের ‘ব্লাক ডেথ’ হইতেও প্রাণঘাতী।

কেবল কলম্বাস নহে, বিশ্বের নানা প্রান্তে নৃশংসতার সহিত জড়িত অনেকের মূর্তি ভাঙিয়া পড়িতেছে গণবিক্ষোভের মুখে। ইহাদের মধ্যে রহিয়াছে সপ্তদশ শতকের ক্রীতদাস বাণিজ্যের সহিত জড়িত এডওয়ার্ড ক্লস্টনের ভাস্কর্য, বেলজিয়ামে সাবেক বেলজিয়াম রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের ভাস্কর্য, মিউজিয়াম অব লন্ডন ডকল্যান্ডসের বাহিরে রবার্ট মিলিগানের ভাস্কর্য, লন্ডনে পার্লামেন্ট স্কয়ারের সামনে উইস্টন চার্চিলের ভাস্কর্য। কাজী নজরুল ইসলাম লিখিয়াছেন—‘আসিতেছে শুভদিন,/ দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!’ সেই শুভদিন আসা সহজ নহে, তবে তাহা একসময় আসিবে নিশ্চয়ই।