রনি হোসেন
শৈশবে যখন কেউ আমাদের জিগ্যাস করত বড় হয়ে কী হতে চাই? একেক জন একেক রকম উত্তর দিতাম। কেউ হয়তো বা বলত আমি পাইলট হবো, কেউ ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বড় লেখক। আমাদের মধ্যে তখনো এই ধারণা জন্ম নেয়নি যে, বড় হয়ে হয়তো বা আমরা সরকারি আমলাও হতে পারি। ঠিক এটাও, যখন বড় হলাম যে, জীবন সম্পর্কে জানতে শুরু করলাম, তখন পদে পদে আমরা নিমজ্জিত হচ্ছি হতাশায় আর একটা নিশ্চিত ভবিষ্যত্ এবং নিরাপদ জীবনের জন্য বেছে নিচ্ছি বিসিএস বা বিভিন্ন ধরনের সরকারি চাকরিই। একটু খারাপ শোনালেও এ কথা সত্য যে, এখন আমরা প্রায় সবাই এ পথেই এগোচ্ছি। আমার কথাগুলো হচ্ছে—এ বছরের ৩৮তম বিসিএসের ফলাফল নিয়ে আমাদের মধ্যে এখন একটা ঝড় বইছে, কেমন ঝড়? ঝড়টা এ রকম এবারের বিসিএসে মেডিক্যাল আর ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের দাপট। এডমিন ক্যাডারে প্রায় আসনই দখল করেছে তারা। এটা নিয়ে সাধারণ ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছে বিষয়টি, কেন মেডিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের লাইনের চাকরি না খুঁজে বিসিএসের পেছনে ছুটছে! এতে করে দেশের বর্তমান চিকিত্সা ব্যবস্থার বিভিন্ন ত্রুটি এবং টেকনিক্যাল দিকের ব্যর্থতার জন্য তাদের এই বিসিএসমুখীতাকে দোষারোপ করা হচ্ছে। আবার যুক্তি আছে তাদের পক্ষেও কেন তারা বিসিএসের দিকে দৌড়াচ্ছেন। সম্প্রতি দেশে করোনা পরিস্থিতি যেন এই বিষয়টাকে একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে। চিকিত্সকদের নেই কোনো নিরাপত্তা। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসরঞ্জাম থেকে তারা বঞ্চিত। সঙ্গে আছে নিজেদের করোনায় আক্রান্ত হওয়া থেকে খাওয়াদাওয়ার সমস্যা। এক্ষেত্রে লাগামহীন দুর্নীতি। স্বাস্থ্য খাতে চিকিত্সকদের খাবারের এক মাসের বিল দেখানো হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। যেখানে তাদের মাথাপিছু দৈনিক খরচ ৫০০ টাকারও কম। আবার প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের বেলায়ও ব্যাপারটা কিছুটা এমন—দেশে নেই তাদের প্রয়োজনীয় প্রায়োগিক ক্ষেত্র। যার কারণে নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা এবং নিজের দক্ষতাবলে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার হাতিয়ার হিসেবেও অনেকে বেছে নিয়েছে এই বিসিএসকে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা ভিন্ন, তাদের এই প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে ভিন্ন এক বিষয় নিয়ে তারা চিন্তিত। তাদের ভাষ্যমতে আগে যেখানে বিসিএসে প্রায় ক্ষেত্রেই ঢাবি শিক্ষার্থীদের আধিপত্য ছিল সেইখানে তারা তাদের জায়গা হারাচ্ছে, এই নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত তাদের চাকরির ভবিষ্যত্ কী? কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে প্রায় শিক্ষার্থীকেই দেখা যায় চাকরির বই নিয়ে পড়ালেখা করতে, অনেক পরিশ্রমের পরেও যখন তাদের জায়গা অন্য কেউ দখল করে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতার কারণে এই তাদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করেছে। তবে আমাদের কি শুধুই বিসিএস নিয়ে ভাবলেই হবে? দেশে অনেক ক্ষেত্রই চালু আছে যেখানে চাইলেই চাকরি পাওয়া যেতে পারে নিজেকে দক্ষ এবং যোগ্য করে তুলতে পারলে। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? আমাদের যা করার তা হচ্ছে—এখন নিজেদের মধ্যে যে পটেনশিয়ালিটি আছে তাকে কাজে লাগানো। নিজের ভেতরের প্রতিভাকে বের করে আনা। সেটা যে কোনো ক্ষেত্রেই হতে পারে। বিসিএসের চাইতে বেশি বেতনের চাকরিও বাজারে আছে। কিন্তু আমাদের চিন্তাটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে, এই করোনাকালীন সময় নিজেরাই প্রত্যক্ষ করেছি সরকারি চাকরি ছাড়া অন্য চাকরি যে কোনো মুহূর্তেই হাতছাড়া হতে পারে এবং জীবনে নেমে আসতে পারে বেকারত্ব, বেসরকারি চাকরিগুলোর নিশ্চয়তা না থাকাটাও এখন সবাইকে ঘাবড়ে দিচ্ছে। গ্যারান্টিহীন চাকরি কে-ই বা করতে চায়? করোনা-পরবর্তী সময়েই বা এত বিশাল একটা বেকারত্বের ধাক্কা এবং চাকরিযুদ্ধ কীভাবে সামাল দেব আমরা—সেটাও একটি বড় প্রশ্ন। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অবশ্যই সরকারি এবং বেসরকারি চাকরির মধ্যে যে অসামঞ্জস্যতা আছে সেটাকে সমন্বয় করতে হবে, নতুবা বড় একটা বিপর্যয়ের দিকেই যাচ্ছে আমাদের প্রজন্ম। আমাদের চাকরি এবং শিক্ষাব্যবস্থা উভয়কেই এক্ষেত্রে একদম শুরু থেকে গোছাতে হবে, আমাদের প্রজন্ম এত উন্নয়নের সমস্যা নিয়ে ভুগছে পরের প্রজন্মের কাছে আমরা কী রেখে যাবো বা তাদের আমরা কোথায় নিয়ে যাবো—সেটা ভাবার আগে আমাদের এখনই ভাবা উচিত আসলে আমরা কোথায় যাচ্ছি এবং কী ভাবছি?
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
