অণুগল্প

ভাইরাস

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২০, ২১:৩৮

আজাদ আপাদমস্তক স্মার্ট। প্রিয় বন্ধুরা তাকে অলরাউন্ডার বলে ডাকে আর স্তুতির কোনো কমতি তো নেই-ই। 

ছয় মাস আগে একটি প্রাইভেট কোম্পানির সহকারী অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে কাজে যোগদান করেছে আজাদ। যোগদানের শুরু থেকে সারাটা অফিস নিজের করে নিয়েছে। ম্যানেজমেন্টের থিউরিই বদলিয়ে দিয়েছে। ইনফরম্যাল আর ইন্টারপারসোন্যাল রিলেশনশিপ অতীব দক্ষতার সঙ্গে বিনির্মাণ করেছে। মুখে মুখে বলে, অফিস হলো আমার দ্বিতীয় বাড়ি। কৃষকের যেমন ফসলের মাঠ, আমার তেমনি জীবিকার জন্য অফিস। কাজে না হলেও চাল-চলনে তার ব্যস্ততা প্রকাশ পায় দারুণভাবে। শুরু হয় ওভারটাইম নেওয়া। কোনো মাসে ওভারটাইমে মাসিক বেতনের প্রায় সমান।

বন্ধুত্বের ব্যাপকতা, গভীরতা ও গাঢ়ত্ব বাড়ে নাজিমের সঙ্গে। সরল প্রকৃতির নাজিম অবশ্যই চৌকস আজাদের বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি মূল্যায়ন করে তার করিত্কর্মের বৈশিষ্ট্যকে। দুপুরে একসঙ্গে খাওয়ার সময় হিন্দি মুভির এমন ডায়লগ আওড়ায় যা নাজিম জীবনেও শোনেনি। শুধু হিন্দি হলেও হতো! মাঝে মাঝে ইংরেজি মুভির ডায়লগ আর কাহিনি যখন বলে তখন নাজিম নিজেকে বড়ো অসহায় মনে করে। হতাশ নাজিমের মনে হয় আজাদের যোগ্যতার কাছে সে নস্যি।

একদিন দুপুরে খাওয়ার সময় আজাদ বলল, দোস্ত তুমি ওভারটাইম করতে পারো না?

ওভারটাইম? কাজ তো বেশি না। দিনের কাজ দিনেই শেষ করে ফেলতে পারি। তাহলে ওভারটাইম করব কীভাবে?

শ্লেষের হাসি হাসে আজাদ। তারপর বলল, এই জগত্ হলো চালাকের। বোকারা এই জগতে টিকতে পারে না, বুঝলে দোস্ত?

না।

বুঝলে না?

না, বুঝলাম না।

একটু আস্তে আস্তে কাজ করবে। তারপর অন্য কাজ করবে। বাথরুমে গিয়ে বসে থাকবে। কয়েকবার চা খাবে। ব্যস দেখবে দুই ঘণ্টা সময় প্রতিদিন ওভারটাইম করতে পারবে।

নাজিম বলল, এসব করলে আমার কাজ করব কখন?

আজাদ বলল, আরে বোকা বন্ধু। কাজ করবে পাঁচটার পর। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত কাজ করবে আর দুই ঘণ্টা ওভারটাইমের বিল করে দেবে। বুঝলে?

বুঝলাম না। তাহলে আমি অফিস টাইমে কী করব?

আজাদ আবার বোঝায়। কিন্তু নাজিম বোঝে না। নাজিমের মাথায় ঢোকে না যে, অফিসে তার কাজের সময় সে কী করবে? শেষ পর্যন্ত আজাদ বলল, ঠিক আছে তোমার বুঝে দরকার নেই। আমি প্রতিদিন অফিসে যা যা করি তুমিও তা তা করবে।

পরের দিন থেকে আজাদকে নাজিম অনুসরণ করতে শুরু করে। আজাদ যখন চা খায় সেও চা খায়। খুব ধীরে ধীরে রাজকীয় হালে। আজাদ যখন পেপার পড়ে সেও পড়ে। আজাদ যখন বাথরুমে যায় তখন সেও বাথরুমে যায়। প্রথম প্রথম অবশ্যই নাজিম বাথরুম থেকে আজাদের আগে বের হয়ে আসত। পরে আজাদ শেখাল বাথরুমে কীভাবে সময় বেশি নষ্ট করতে হয়। বাথরুমে যাওয়ার জন্য বেশি বেশি পানিও খাওয়া দরকার।  

মাসের শেষে নাজিমও আজাদের মতো ওভারটাইম পেল প্রায় বেতনের সমান টাকা। কিন্তু দ্বিতীয় মাসে এসব অহেতুক কাজ করতে অস্বস্তিবোধ করে এবং আগের মাসের ঘটনা সিইওকে জানিয়ে দেয়।

বিস্মিত হন সিইও। এই অফিসে এমন ঘটনা ঘটতে পারে এবং আজাদ ঘটাতে পারে তা তার কাছে রীতিমতো অবিশ্বাস্য।

দুদিন পর। প্রথমে আজাদকে ডেকে টার্মিনেশন লেটার হাতে দিয়ে সিইও বললেন, গুডবাই আজাদ।

মাথা নিচু করে আজাদ চলে যায়।

পরের দিন নাজিমকেও টার্মিনেশন লেটার হাতে দিয়ে তিনি বললেন, আমার ফার্মে সত্ ও চালাক মানুষের দরকার। সত্ কিন্তু বোকার প্রয়োজন নেই। বোকারা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। গুডবাই।

রুম থেকে বের হয়ে নাজিম। সাততলা বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। নাজিমের মনে হলো, নিপাট নিশ্ছিদ্র ঝুলন্ত ঝকঝকে আকাশের গাঢ় নীল যেন বেদনার রং।