বাঁশ ও লৌহ এক জিনিস নহে। যদি তাহাই হইত, তবে ইংরেজরা হার্ডিঞ্জ ব্রিজে মূল্যবান লোহা ব্যবহার না করিয়া বাঁশ দিয়াই চালাইয়া যাইত। দুঃখের বিষয়—বাংলাদেশের কিছু মানুষের মন এতটাই কলুষিত হইয়া উঠিয়াছে যে, তাহারা রড বা লোহা এবং বাঁশের পার্থক্য মনে রাখিতে চাহিতেছেন না। আমরা প্রায়ই দেখিতে পাইতেছি—সড়ক, স্কুলের ছাদ, কালভার্ট নির্মাণে অধিক মুনাফার লোভে ঠিকাদারগণ রডের পরিবর্তে বাঁশের ব্যবহার করিতেছেন। প্রশ্ন জাগে, এই বাঁশ আপনারা কোথায় ব্যবহার করিতেছেন, কালভার্টে, রাস্তায়, নাকি জাতির শরীরের বিশেষ কোনো অংশে? তেমনি আরো একটি ঘটনার কথা জানা গিয়াছে দৈনিক ইত্তেফাকের একটি রিপোর্ট হইতে। ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার আছিম-পাটুরী ইউনিয়নের কালভার্ট নির্মাণকাজে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করা হইয়াছে। উহা স্থানীয় সরকার বিভাগের এলজিএসপি প্রকল্পের কাজের অংশ। ইহার পূর্বেও আমরা এই বাঁশ সমাচার লইয়া অনেক বার লিখিয়াছি। সহযোগী অনেক দৈনিকও লিখিয়াছে; কিন্তু না বোধেদয় হইয়াছে ঠিকাদারের, না দায়িত্বে সচেতন হইয়াছেন কাজের তদারকিতে থাকা প্রকৌশলীরা। এই কর্মে সরকারের যে অর্থের অপচয় হয় তাহাই নহে, অদূর ভবিষ্যতে মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকি হইয়া দাঁড়ায়।
ইহা বুঝিতে অসুবিধার কোনোই কারণ নাই যে, সংশ্লিষ্টরা কী করিয়া এবং কেন রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার চক্ষু মুদিয়া মানিয়া লন! এই ধরনের কাজে ব্যবহূত বস্তুটি বাঁশ না রড তাহা পরখ করিতে কোনো ল্যাবে যাইতে হয় না। চর্মচক্ষুতেই পরখ করা যায়। তাহার পরও কেন রডের বদলে বাঁশ ব্যবহূত হয়! স্থানীয় পর্যায়ে এই কাজ তদারকির জন্য ওয়ার্ক অ্যাসিসট্যান্ট থাকেন, তাহার উপর উপসহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলীগণ থাকেন। কী করিয়া এই ধরনের কিম্ভূতকিমাকার কর্ম হইতে পারে!
আরো বড় হতাশার বিষয়, যখনই এই ধরনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, অধুনা ফেসবুকে ভাইরাল হয়—তখনই দেখা যায় ব্যাখ্যা-বিবৃতি এবং শোকজ করিয়া ঘটনা সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলিতে থাকে; কিন্তু বিশেষ কোনো ডিপার্টমেন্টাল অ্যাকশন, ঠিকাদারকে কালো তালিকা করা অথবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘটনা লক্ষ করা যায় না। অথচ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হইলে এই ধরনে কর্ম পুনরায় ঘটাইবার সাহস তাহারা পাইতেন না। আমরা ইহার স্থায়ী প্রতিকার চাই। এই ধরনের অপরাধকে প্রয়োজনে ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে গণ্য করিয়া গুরুদণ্ডের বিধান করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, এই ধরনের কর্মে একজন ঠিকাদারের চাইতে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী কম দায়ী নহেন। আধুনিক যুগে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ তদারকিতে নির্মিত কাজে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করার ঘটনা পৃথিবীর, এমনকি কোনো পশ্চাত্পদ দেশে ঘটে বলিয়া আমাদের জানা নাই; কিন্তু বাংলাদেশে ইহা বারংবার আমরা ঘটিতে দেখিতেছি। বিষয়টিতে দেশের নীতিনির্ধারকদের কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নাই।
