কোষ্ঠকাঠিন্য: অবহেলা নয়

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:১৪

অধ্যাপক ডাঃ এ বি এম আব্দুল্লাহ

কোষ্ঠকাঠিন্য একটি খুবই সাধারণ সমস্যা, তবে অবশ্যই বিরক্তিকর ও কষ্টকর। এমন কোনও ব্যক্তি নেই, যার জীবনে কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য হয়নি। ভুক্তভোগীর মূল সমস্যাই হলো খুব শক্ত পায়খানা, টয়লেটে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্টা করেও পরিষ্কার না হওয়া বা অসম্পূর্ণ হওয়ায় অনেকেই অস্বস্তিতে ভোগেন। এমনকি এর ভয়ে বিভিন্ন ধরণের খাওয়া দাওয়া করতেও ভয় পান। তবে দীর্ঘ মেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্যকে কোনক্রমেই অবহেলা করা যাবে না। কারণ এটিই হতে পারে জটিল কোন রোগের প্রাথমিক লক্ষণ।

কোষ্ঠকাঠিন্য কী: পায়খানা শক্ত বোঝাতে আমরা কোষ্ঠকাঠিন্য শব্দটি ব্যবহার করি। মেডিকেল সাইন্সের পরিভাষায় পায়খানা সপ্তাহে তিন বারের কম অথবা পরিমাণে কম, শক্ত বা শুকনা হওয়া, বেশি সময় ধরে চেষ্টা করার পরও মলত্যাগ না হওয়াকেই কোষ্ঠকাঠিন্য বলে। কেউ পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার পরও যদি সপ্তাহে তিন বারের কম মলত্যাগ করেন তখন একে কোষ্ঠকাঠিন্য বিবেচনা করে সঠিক কারণ নির্ণয় জরুরি।

লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ: কোষ্ঠকাঠিন্যর মূল উপসর্গটিই হলো শক্ত ও কঠিন মল। এর সাথে নিম্নে উল্লেখিত এক বা একাধিক উপসর্গও থাকতে পারে।

- মলত্যাগে অনেক বেশি সময় লাগা, তারপরও অসম্পূর্ণ মনে হওয়া

- অনেক বেশি চাপের প্রয়োজন হওয়া, তারপরও অনেকের ভাষায় পায়খানা ক্লিয়ার না হওয়া, মলদ্ব্বারের আশপাশে ও তলপেটে ব্যথা,  প্রায়ই আঙ্গুল দিয়ে সাপোজিটিরি বা অন্য কোনো মাধ্যমে মল বের করার চেষ্টা করা।

কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ: নানা কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হতেই পারে। অনেকের এমনিতে কোন রোগ ছাড়াই কোষ্ঠকাটিন্য হয়, আবার বেশ কিছু রোগের লক্ষণ হিসেবেও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। কিছু কিছু কারণ জীবন যাপনের পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট, আর কিছু কিছু হয়ে থাকে বিভিন্ন রোগের লক্ষণ হিসেবে। শারীরিক গঠনের পাশাপাশি কিছু খারাপ অভ্যাস এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেতে যান্ত্রিক জীবনযাত্রা এর জন্য দায়ী। কোষ্ঠকাঠিন্য যে কোন বয়সেই হতে পারে। তবে বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা বেশি হয়।

জীবন যাপনের পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট কারণগুলো হচ্ছে-

- অসম খাদ্যাভ্যাস যেমন আঁশযুক্ত খাবার ও শাক সবজি কম খাওয়া।

- নিয়মিত ফাস্টফুট খাওয়া এবং পরিমাণে বেশি খাওয়া। পানি বা তরল খাবার কম খাওয়া।

- সময় মত মলত্যাগ না করে চেপে রাখার প্রবণতা। আমাদের দেশের বেশিরভাগ কর্মজীবী মহিলাদের এই অভ্যাসটা আছে। কর্মস্থলের টয়লেট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত প্রাইভেসি না থাকায় তারা সাধারণত কর্মস্থলে টয়লেট ব্যবহার করেন না।

- অতিমাত্রায় দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের মধ্যে থাকা।

- শারীরিক বা কায়িক পরিশ্রম কম করা। দুর্ঘটনা, কোনো কোন অপারেশনের পরে বা কোনো রোগের কারণে দীর্ঘ দিন শয্যাশায়ী থাকা।

- গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য একটি স্বাভাবিক সমস্যা।

- শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের বুকের দুধ ছাড়া কৌটার দুধ খাওয়ালে এবং বয়স অনুযায়ী অন্যান্য খাবার না খাওয়ালে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

রোগের সাথে সংশ্লিষ্ট কারণগুলো হচ্ছে-

- কলেরেকটাল তথা মলাশয়ের ক্যান্সার

- মলদ্ব্বারে ফিশার, পেরিএনাল এবসেস ইত্যাদি রোগে মলদ্ব্বারে বেশি ব্যথা হয়, ফলে ভয়ে পায়খানা না করলেও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

- হাইপোথাইরয়ডিজম, হাইপার প্যারাথাইরয়ডিজমের মত হরমোন ঘঠিত রোগ, ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি।

- পার্কিনসন’স ডিজিজ, আই বি এস।

বিভিন্ন ধরণের ওষুধ সেবন করার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায়ও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। যেমন-

- রক্তশূন্যতায় আয়রণ জাতীয় ওষুধ খেলে।

- ক্যালসিয়াম, এলুমিনিয়াম ও ক্যালসিয়াম যুক্ত এন্টাসিড।

- আফিম, মরফিন জাতীয় নার্কোটিক ওষুধ।

- মানসিক রোগের ওষুধ ইত্যাদি।

কোষ্ঠকাঠিন্যের জটিলতা: দীর্ঘ দিন যাবত কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগলে শরীরে, বিশেষ করে মলদ্ব্বারে অনেক ধরণের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। যেমন-

- মল ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া, রেকটাল প্রোলাপস বা মলদ্ব্বার বাইরে বের হয়ে আসা।

- অর্শ বা পাইলস, ফিস্টুলা বা ভগন্দর, এনাল ফিশার বা গেজ রোগ হওয়া।

- প্রস্রাবের সমস্যা।

- ইন্টেস্টাইনাল অবস্ট্রাকশন বা অন্ত্রে ব্লক বা প্যাঁচ লেগে পেট ফুলে যাওয়া, পেটে ব্যথা।

- অরুচি, বমিভাব বা বমি হওয়া, অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া, অনেক দিন ঠিকমতো খেতে না পারার কারণে ওজন কমে যাওয়া, রক্তশূন্যতা হওয়া ইত্যাদি।

চিকিত্সা : কোষ্ঠকাঠিন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যা। প্রাথমিকভাবে এর চিকিত্সা হচ্ছে-

- প্রচুর পানি, শরবত বা তরল খাবার গ্রহন করা, বেশি করে শাক সবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া।

- নিয়মিত ব্যায়াম এবং হাটাচলা করা।

- ইসবগুলের ভুষি, বেল, পেঁপে ইত্যাদি নিয়মিত খাওয়া। সোনাপাতা, এলোভেরা বা ঘৃতকুমারী খেলেও উপকার পাওয়া যায় এবং হালকা গরম দুধ পান করা।

- এতে উপকার না হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পায়খানা নরম হওয়ার ওষুধ, যেমন ল্যাক্সেটিভ  ব্যবহার করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য অনেকেই কারণ শনাক্ত না করে বা উপরোক্ত প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো না নিয়েই প্রথম থেকে মল নরম করার বিভিন্ন ধরণের ওষুধ এবং মলদ্ব্বারের ভেতরে দেওয়ার ওষুধ প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে থাকেন যা মোটেও উচিত নয়। নিয়মিত এসব ওষুধ ব্যবহার করলে সেটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। এর ফলে মলদ্ব্বারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা আর থাকে না। তাই কোষ্ঠকাঠিন্যের সঠিক কারণ নির্ণয় করে চিকিত্সা নেয়া উচিত। একথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, মলত্যাগের সময় মলের সাথে তাজা রক্ত গেলে, মলদ্ব্বারে ব্যথা হলে, চিকন মল বের হলে দেরি না করা ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য হলে দ্রুত চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে।

কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করার উপায়:

কথায় আছে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করার জন্য কিছু টিপস:

- খাদ্য তালিকায় সুষম খাদ্যের প্রতি জোর দিতে হবে, যাতে প্রচুর শাক সবজি ও আঁশযুক্ত খাবার থাকে। ফলমূল, সিরিয়াল জাতীয় খাদ্য খাওয়া ভালো।

- ফাস্টফোড যথা সম্ভব কম খাওয়া। অতিরিক্ত চা, কফি পরিহার করা।

- বেশি করে পানি বা অন্য যে কোন তরল খাদ্য পান করা।

- দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপমুক্ত জীবন যাপনের চেষ্টা করা।

- নিয়মিত ব্যায়াম করা বা যে কোনো ধরণের শারীরিক পরিশ্রম করা।

- যতটুকু সম্ভব, পায়খানা চেপে না রাখার অভ্যাস করা।

- দীর্ঘ মেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য অবশ্যই চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।

কোষ্ঠকাঠিন্য হলেই যে জটিল কোন রোগ আছে এটা যেমন সঠিক নয়, তেমনি একেবারে অবহেলা করাও উচিত নয়। বিশেষ করে অনেকেই মনে করেন, মেয়েদের কোষ্ঠকাঠিন্য স্বাভাবিক। এটা ভেবে অবহেলা করাও ঠিক নয়। কোষ্ঠকাঠিন্য জটিল রোগ না হলেও, কোন কোন রোগের পূর্বাভাসও হতে পারে। যেমন মলাশয়ের ক্যান্সার। তাই কোন অবহেলা নয়, বিশেষ করে হঠাত্ কোষ্ঠকাঠিন্য হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একটু সচেতনতা এবং জীবন-যাপন পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনলেই সুস্থভাবে থাকা সম্ভব।

 

 লেখক:ডীন, মেডিসিন অনুষদ

অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়