ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে
রাত দুপুরে অই।
ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে
ট্রেনের বাড়ি কই?
কবি শামসুর রহমানের ‘ট্রেন’ কবিতার এই চারটি লাইন মনে রাখতে কোনো চেষ্টাই করতে হয়নি! সেই ছোটবেলা থেকে এই কবিতায় খুঁজেছি ট্রেনের বাড়ি! বাংলাদেশে ট্রেনের বাড়ি একটিই, সৈয়দপুরে। সিলেটকে যেমন ‘বাংলাদেশের লন্ডন’ বলে থাকেন অনেকেই, তেমনি সৈয়দপুরকে বলা হয় ‘বাংলাদেশের চায়না’! কেন বলা হয় সেই প্রশ্নটি করেছিলাম সৈয়দপুর শহরের চা-দোকানি রহমান আলীকে। ৬০ বছর বয়সী এই মানুষটি কেতলি থেকে কাপে লিকার ফেলতে ফেলতে বললেন, ‘অনেক আগে মানুষের মুখে মুখে ছিল এই নাম। কিন্তু এখন এই নামের প্রচলন নেই। এক সময় বাংলাদেশে যত জিনিস নকল করা হতো তার অধিকাংশই এই সৈয়দপুর থেকেই হতো!’
রহমন আলী জানান, বিদেশি ছোট্ট যন্ত্রাংশ, বিদেশি সাবান, লোশন, ইন্ডিয়ান সাইকেল, সিগারেট থেকে শুরু করে অনেক নামিদামী বিদেশি পণ্যের নকল করা হতো সৈয়দপুরেই। তবে এখন খুব একটা নেই বললেই চলে। তবুও সাবধান! তবে সৈয়দপুরের রেলওয়ের কারাখানাটি একদমই নকল নয়। এখানে বাংলাদেশের ট্রেনগুলোর মেরামত করা হয়। নাট-বল্টু থেকে শুরু করে রেলওয়ের ব্রডগেজ ও মিটারগেজ লাইনের বগি মেরামতসহ সব কাজ করা হয়। এই কারখানার রয়েছে অনেক দীর্ঘ ইতিহাস।
১৪৮ বছর আগের কথা। পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্পদ আহরণের জন্য নির্মাণ করতে থাকে রেলপথ। আর সেই রেলপথগুলো পুরো ভারত উপমহাদেশকে একসঙ্গে বেঁধেছিল। সেসময়ে ইংরেজ বেনিয়ারা সৈয়দপুরে ১১০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠা করে বিশাল রেলওয়ে কারখানা, যা আজও বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা হিসেবে পরিচিত। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ছোট্ট শহর সৈয়দপুর। এক সময় বাণিজ্যিক শহর হিসেবেও পরিচিত পায় সৈয়দপুর। তবে নীলফামারি জেলার এই শরটিকে সবাই চেনে ‘বাংলাদেশের ট্রেনের বাড়ি’ হিসেবেই।
১৯০৩ সালে কারখানাটি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ও মালবাহী গাড়ি এবং স্টিম লোকোমোটিভ মেরামত কারখানায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের দিকে কারখানায় বিভিন্ন মেশিন শপ স্থাপন করে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী গাড়ি মেরামত ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উত্পাদনের সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সৈয়দপুর কারখানায় রয়েছে ২১টি উপকারখানা। কারখানাটি পশ্চিম রেলের ব্রডগেজ ও মিটারগেজ রেলপথের যাত্রীবাহী বগি (ক্যারেজ), মালবাহী বগি (ওয়াগন) এবং পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের স্টিম রিলিফ ক্রেনের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, আয়ুষ্কাল ঠিক রাখার পাশাপাশি কোচের গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এখানে ক্যারেজ, ওয়াগন ও লোকোমোটিভের ১ হাজার ২০০ ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতা আছে।
ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান উভয় আমলেই কারখানাটি শতশত মেশিনের শব্দ ও কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদচারণায় মুখরিত ছিল। এখনো এই কারখানা থেমে থাকে না একটি মুহূর্তও।
জনসাধারণের জন্য এটি উন্মুক্ত না হলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষাসফর বা পরিদর্শন করে বাস্তব জ্ঞান অর্জনের জন্য সেরা জায়গা এটি। কারখানার অফিসের সামনে সবুজ চত্ত্বরে রাখা আছে ব্রিটিশ আমলের ন্যারোগেজ ইঞ্জিন। ৭২ সালে সর্বশেষ ইঞ্জিনটি চলতো বাগেরহাট-রূপসা সেকশনে। ১৯০১ সালে ইংল্যান্ডের ভলকান কোম্পানির তৈরি এই ইঞ্জিনটিসহ এ ধরনের ৩টি ইঞ্জিনের ঠাঁই হয়েছে এখন সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার লোকো ট্রান্সপোর্ট মিউজিয়ামে। কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই ইঞ্জিনগুলো।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা বর্তমান সরকার সৈয়দপুর কারখানাকে আধুনিকীকরণ করতে সচেষ্ট আছেন। তার প্রচেষ্টায় একদিন এই কারখানা আর অবহেলিত থাকবে না। তখন সৈয়দপুর রেল কারখানাতেই নতুন কোচ তৈরি হবে। শুধু তাই নয়, সেই কোচ বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব হবে।
ঢাকা থেকে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনে সরাসরি সৈয়দপুরে চলে যেতে পারেন। ট্রেনের ভাড়াও কম। এছাড়াও গাবতলি, কলেজগেট, মহাখালী থেকে সৈয়দপুর সরাসরি অনেকগুলো বাস সার্ভিস চালু আছে। এছাড়াও বিমানযোগে সরাসরি সৈয়দপুরে চলে যেতে পারেন। সৈয়দপুরে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ও বেঙ্গল এয়ারওয়েজের বেসরকারি বিমান সপ্তাহে দু-দিন চালু আছে।
