মৃণালদার ‘সেলিব্রেশন অব লাইফ’

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:১৭

 

‘পরিষ্কার বাংলা বলতে পারো?’ আপাদমস্তক আমার দিকে চেয়ে জানতে চাইলেন মৃণালদা। ভারি রাগ হয়ে গেল, আমি আসলে একটা জ্যাকেট পরেছিলাম, পায়ে ছিল বুট। একটু জবরজং লাগছিল ঠিকই সেজন্য বোধহয় মৃণালদা... তা বলে বাংলা জানি না! বললাম, কেন জানবো না? বাঙালির ছেলে তো। ‘না, তোমার কেমন একটা ইংরেজি-ইংরেজি ভাব তো সবসময়। ওরকম হলে কিন্তু চলবে না।’ মৃণালদার গলায় অবিশ্বাসের সুর। সালটা ৮০-৮১, চলচ্চিত্রে আমাকে নেওয়ার কথা ভাবছেন। সদ্য তখন স্টেটম্যানে চাকরিটা ছেড়েছি। সাংবাদিকতা করতাম। সেখান থেকেই একদিন ফোন করে জানালো, মৃণাল সেন তোমাকে খুঁজছেন, শিগগির দেখা করো।

প্রথমদিনের শুটিংয়ে একটা ট্রামে চাপিয়ে পরের স্টপেজ নেমে যাবো, বলতে বলতে ক্যামেরা হাতে মহাজনের সঙ্গে নিজেও উঠে পড়লেন মৃণালদা। ট্রাম চলছে, ক্যামেরাও চলছে, পাশে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। ‘টিকেটটা হাত থেকে মুখে নাও।’ দু-ঠোঁটের মাঝখানে টিকেটটা চেপে ধরতেই বললেন, ‘চিবাতে থাকো।’ চিবোচ্চি, চিবোচ্ছি। একবার বললেন, ‘পারলে খেয়ে ফেলো।’ বলা মাত্রই গোঁত্ করে গিলে ফেললাম টিকেটটা, কোনো ডায়লগ বলতে দেননি সেদিন। অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।

ওই চালচিত্র-এর শুটিং ওই একদিন। ‘এ হলো অঞ্জন, নাটক করে, এই ছবিতে অভিনয় করবে’—বলে উত্পলদার কাছে বসিয়ে কোথায় যেন চলে গেলেন মৃণালদা। আমি কেন, নতুন কারোরই উত্পল দত্তের মুখে পড়া আর বাঘের মুখে পড়া সমান! তাছাড়া আমি নিয়মিত নাটক করতাম তো ম্যাক্সমুলারে, আর সেটাই আরো ভয়ের। তখন করছিলাম ‘মারা-সাদ’, পেটার ভাইসের একটা নাটক। এই যে বলে না যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়!

 

 

চেয়ারে বসে বই থেকে মুখ এতটুকু না সরিয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে প্রথম প্রশ্ন উত্পলদার—‘কলকাতায় মারা-সাদ নাটকটি বাংলাতে হচ্ছে, জানা আছে?’ উত্তরে আমার ‘হ্যাঁ’ শুনেই পরের প্রশ্ন—‘যেখানে বিপ্লবী জ্যাঁ-পল মারার পার্টটা কে করেছে জানো?’ যেই বলেছি ‘আমি’ অমনি গলায় আঁতকে ওঠার মতো একটা আওয়াজ তুলে বললেন, ‘কী সাহস!’

মৃণালদার ছবি তৈরি করা নিয়েই একটা ছবি করা যায়। ওর তো সব গম্ভীর গম্ভীর ছবি, অথচ শুটিংয়ের সময় ইউনিটে কী মজা আর হইহুল্লোড়টাই না হয়, আমি কিন্তু বিশৃঙ্খলার কথা বলছি না। অসম্ভব আমুদে, ফুর্তিবাজ, আনন্দময় একজন মানুষ মৃণালদা, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘জোভিয়াল’। সারাক্ষণ এর-ওর পেছনে লাগছেন, লেগ-পুলিং করছেন, ঠাট্টা-ইয়ার্কি-ফাজলামো করছেন, মারাত্মক সেন্স অব হিউমার।

শট নেওয়ার আগে মৃণালদা আমাদের দু-জনকেই পাকড়াও করে এমন এক-একটা গল্প বলছেন, সম্ভবত চ্যাপলিনকে নিয়ে (ঠিক খেয়াল নেই), আমরা হেসে গড়িয়ে পড়ছি। মমতা তো পুরোটাই শুনলোই না, ‘না না, আমি কিছুতেই শুনবো না, আর শুনলে শট দিতে গিয়েও হেসে ফেলবো’ বলতে বলতে দৌড়ে চলে গেল। আর আমাকে হাসাতে হাসাতে হঠাত্ চেঁচিয়ে উঠলেন মৃণালদা, ‘রেডি সকলে? এক্ষুণি শট নেবো।’ আমি একেবারে অপ্রস্তুত। ওই খারিজ-এই রাস্তার ভিড়ের ভেতরে আমাকে নিয়ে একটা দৃশ্য ছিল। শট নেওয়ার সময় ভিড় সামলাতে হচ্ছে। যথেষ্ট সাবধান সকলে, যাতে কোনো ঝামেলা না হয়, আমিও বেশ টেনশনে আছি। যাই হোক, শটটা তো হয়ে গেল। আমিও হাঁফ ছাড়লাম, মৃণালদা কী বলেন শোনার অপেক্ষায় আছি। ওমা! ‘কাট’ বলেই মৃণালদা দেখি দৌড়ে চলে গেলেন ভিড়ের দিকে। জটলার ভেতরে ঢুকেই এক লোককে চড়-চাপটি মারা শুরু করলেন, ইউনিটের লোকজন দৌড়ে গিয়ে থামালো। কী হয়েছে! লোকটি নাকি এতবার বলে দেওয়া সত্ত্বেও এমনভাবে হাত নেড়েছে যে সেটা ফ্রেমের মধ্যে চলে এসেছে।

ভূতেও ভীষণ ভয় পেতেন মৃণালদাকে। কমিউনিজম কিংবা কমিউনিস্টদের ভক্ত ওরকম একটা লোক আছে যে, এত ভয় পেতে পারে ভূতের! মুর্শিদাবাদের বিশাল রাজবাড়িতে অন্তরীণের শুটিং চলছে। নির্জন দুপুর, রোদ আর ছায়ায় মাখা থমথমে পরিবেশ। শটের আগে মেকআপ নিচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি বড্ড বেশি রকম হাঁকডাক করছেন মৃণালদা। কাজের কথাই বলছেন, নানারকম নির্দেশও দিচ্ছেন, কিন্তু এত জোরে বলতে শুনিনি কখনো। সাধারণত আস্তেই কথা বলেন। কথার ফাঁকে ফাঁকে আবার গানও গেয়ে উঠেছেন দু-এক কলি। হলোটা কী মৃণালদার, মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতেই কে যেন একটা বলে উঠল—ভূত তাড়াচ্ছেন।

ওই অন্তরীণ-এই দেখেছি কী তুমুল ঝগড়া শশীর সঙ্গে ক্যামেরা বসানোর অ্যাঙ্গেল নিয়ে। ক্যামেরাম্যান শশী আনন্দের সঙ্গে বয়সের তফাত্ হয়তো তিরিশ বছরের, তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই মৃণালদার। ঝগড়া-টগড়ার পরই আবার চূড়ান্ত ভাব। সবকিছুই খুব স্বভাবিকভাবে নিতেন। সবসময় যে সোচ্চার হতেন তাও না, চুপচাপ যেটা ভালো বুঝতেন সেটাই করতেন। মনে আছে, খণ্ডহর-এর শুটিংয়ে লাঞ্চ ব্রেকে একটা সামিয়ানা টাঙিয়েছেন মুকুলবাবু, প্রোডাকশন ম্যানেজার। একদিকে বসিয়েছেন নাসির-শাবানাদের, অন্যদিকে ইউনিটের বাকিরা। মৃণালদাকে বসানো হয়েছে ওই শাবানাদের দিকেই। হঠাত্ দেখি আস্তে আস্তে সামিয়ানাটা তুলে নিজের খাবারটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলেন মৃণালদা, বসে পড়লেন বাকিদের সঙ্গে। তার দেখাদেখি শাবানাও বেরিয়ে এলো, তারপর নাসির। একজন চেঁচিয়ে বললো, মুকুলবাবু, সামিয়ানাটা তুলে দিন।

ছবি করাটা আসলে ছিল মৃণালদার কাছে সেলিব্রেশন অব লাইফ।

 

অনুলিখন:নুরুল করিম