খাল-বিল, নদনদী বা জলাভূমির উপর সেতু নির্মাণ করা হয় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য। কিন্তু নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা সদরের সিম্বা খালে সেতু কেন নির্মাণ করা হইয়াছে—তাহা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হইয়া দেখা দিয়াছে। ইত্তেফাকের চিঠিপত্র কলামে প্রকাশিত এক পাঠকের বয়ান হইতে জানা যায়, সেতুখানি দিয়া যাতায়াতের জন্য কোনো সংযোগ-সড়ক নাই। ফলে কোনো কাজেই আসিতেছে না ঐ সেতু। এখন প্রশ্ন হইতেছে, জনগণের যদি কোনো কাজেই না আসে, তাহা হইলে সেতু নির্মাণ করা হইল কেন? ইহা কি হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘রাজার নূতন পোশাক’ গল্পটির মতো নহে? রাজার নূতন পোশাকের মতো নূতন সেতুর সংযোগ-সড়ক, যাহা আসলে অদৃশ্য। গল্পটি নিশ্চয়ই অনেক পাঠকেরই মনে আছে। রাজার অতিসূক্ষ্ম নূতন পোশাকের শখ হইয়াছে। দুই জন প্রতারক তাহাকে এমন একটি অতি সূক্ষ্ম পোশাক দিয়া মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করিয়াছেন, যাহা আদতে কোনো পোশাকই নহে। কিন্তু প্রতারকরা যাহাতে ধরা না পড়ে এই জন্য রাজাকে বলিয়া দিয়াছে—যাহারা বোকা তাহারা আপনার এই পোশাক দেখিতে পারিবেন না। একমাত্র বুদ্ধিমানরাই এই পোশাক দেখিতে পারিবেন। ইহার পর রাজা যখন কথিত নূতন পোশাক পরিয়া সভায় হাজির হইলেন তখন সকলেই দেখিলেন রাজা উলঙ্গ। কিন্তু রাজা সূক্ষ্ম পোশাকের যেই মহিমা বর্ণনা করিয়াছেন, তাহাতে চারিদিক হইতে প্রশংসা আসিতে লাগিল। কে আর বোকা বনিতে চাহেন? সকলেই রাজার কাছে ‘বুদ্ধিমান’ই প্রতিপন্ন হইতে চাহেন।
আমরাও কি একইভাবে ‘বুদ্ধিমান’ হইতে চাহিতেছি না? রূপকথার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন এই গল্পটির মাধ্যমে অতি গভীর কিছু প্রতীকী অর্থ প্রকাশ করিয়াছেন। এই গল্পটিকে বিশ্লেষণও করা যায় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হইতে। আমরা কেবল নূতন সেতুর অদৃশ্য সংযোগ-সড়কের সহিত রাজার পোশাককে মিলাইয়া দেখিতে পারি। শুধু নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা নহে, দেশের আরো বহু স্থানে এই রকম সংযোগ-সড়ক ছাড়া সেতু আছে। এই সকল সেতু বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া অব্যবহূত থাকিতেছে। নষ্ট ও পরিত্যক্ত হইতেছে। এমনও দেখা গিয়াছে, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের মধ্যে অথবা লোকালয়বিহীন বিরানভূমিতে, যেইখানে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকেরা মাঠে যাওয়া-আসা করেন জমির আইল দিয়া, সেইখানেও নির্মাণ করা হইয়াছে সেতু। এমনকি, সড়কের উপর সেতু না বানাইয়া তাহা সড়কের সমান্তরাল করিয়া তৈরি করার উদ্ভট ও অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্তও এই দেশে স্থাপিত হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে, সকল সরকারের আমলেই একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদার বিভিন্ন প্রকল্প বাহির করেন কমিশন আদায়ের জন্য। ইহারা রাজার নূতন পোশাক বিক্রয় করা প্রতারকের মতো। কিন্তু, যে জনপ্রতিনিধিরা আছেন তাহারা কী করিয়াছেন? এহেন দুষ্কর্মের দায় তাহারা এড়াইতে পারেন? এই সকল অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
