খবরে প্রকাশ, দেশের আনাচকানাচে অবস্থিত কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলি বন্ধ হইয়া পড়িতেছে বা তাহা বিক্রয়ের জন্য দেওয়া হইতেছে বিজ্ঞাপন। বিশ্বব্যাপী করোনা দুর্যোগকালে এমন হতাশাজনক খবর একের পর এক আসিতেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে যেমন ছাঁটাই চলিতেছে, বেতন হ্রাস পাইতেছে, তেমনি অনন্য উপায় হইয়া তাহা বন্ধও হইয়া যাইতেছে। ফলে দেশের অনেক কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হইয়া যাইবার খবরে বিস্মিত হইবার কিছু নাই। রাজধানী ঢাকা শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেক মানুষ করোনা অভিঘাতের শিকার হইয়া স্বপ্নের শহরই ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছে। এই কারণে বাড়িয়া যাইতেছে টু-লেটের সংখ্যা। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ইতিমধ্যে রাজধানীতে প্রায় ১০০ কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হইয়া গিয়াছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন প্রধানমন্ত্রীর নিকট জরুরি ভিত্তিতে হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দাবি করিয়াছে। বাংলাদেশে করোনাকালে সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে একটি কৌতুক বেশ জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। তাহা হইল—মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্বের সেরা ধনী ব্যক্তি বিল গেটসও যদি বাংলাদেশের নাগরিক হইতেন, তাহা হইলে এই মুহূর্তে দশচক্রে ভগবান ভূতের ন্যায় তিনিও প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রণোদনা দাবি করিয়া বসিতেন! কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলির দার্শনিক ভিত্তি লইয়া আমাদের ভাবিতে হইবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ধারায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে ‘শিশু শ্রেণি’ নামে এক বত্সর প্রি-প্রাথমিক লেখাপড়ার ব্যবস্থা এমনিতেই রহিয়াছে; কিন্তু কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলিতে প্রি-প্রাথমিক শিক্ষা অন্তত চার বত্সর—প্লে, নার্সারি, কেজি-১, কেজি-২। ‘ইনফ্যান্ট’ নামে আরেকটি শ্রেণি আছে কোনো কোনো কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। ইহাতে শিশুদের বয়স বৃদ্ধি পায় এবং তাহারা দেরিতে এসএসসি পাশ করে কিংবা মিথ্যার আশ্রয় লইয়া সার্টিফিকেটে বয়স কমাইতে হয়। অথচ উন্নয়নশীল বিশ্বের নাগরিক হিসাবে আমরা চাই আমাদের তরুণরা দ্রুত পড়াশুনা শেষ করিয়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হইয়া পড়ুক। এই শিক্ষাপদ্ধতির জনক জার্মান শিক্ষাবিদ ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবেল। তিনি খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষাদানের নিমিত্তে ১৮৩৭ সালে জার্মানির ব্লাংকেনবার্গে প্রথম কিন্ডারগার্টেন স্কুল স্থাপন করেন। তাহার আগে ১৮১৬ সালে স্কটল্যান্ডে রবার্ট ওয়েন খোলেন ‘ইনফ্যান্ট স্কুল’। ১৮২৮ সালে কাউন্টেস থেরেসা ব্রুন্সতিক বুদাপেস্টের নিজ বাড়িতে স্থাপন করেন এঙ্গিয়েলকার্ট বা পরিদের বাগান। সেই ধারণারই বিকশিত রূপ কিন্ডারগার্টেন বা শিশুদের বাগান। তবে যেই সকল বাবা-মায়ের সহযোগিতায় শিশুরা বাসায় পড়িতে-লিখিতে জানিত, তাহাদের এই সকল স্কুল গমনে নিরুত্সাহিত করা হইত। পশ্চিমা বিশ্বে কারখানায় কর্মরত নারীদের সুবিধার্থে মূলত এই সকল শিশুবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমাদের জানা মতে, প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আমাদের দেশের কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলিরও নিবন্ধন প্রক্রিয়া আছে বিশৃঙ্খলা দূরীকরণের স্বার্থে। ইহার বিনিময়ে তাহারা বিনা মূল্যে সরকারি বই পান। দেশে এই রকম কিন্ডারগার্টেন রহিয়াছে প্রায় ৪০ হাজার। শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৬ লক্ষ। তবে নিবন্ধন লইবার পূর্বে কিন্ডারগার্টেনের মালিককে এই বলিয়া অঙ্গীকার করিতে হয়, ‘আমি স্কুলটি পরিচালনার জন্য সরকারের নিকট কোনো প্রকার আর্থিক সাহায্য কামনা করব না।’ এই অঙ্গীকারের পর বিদ্যোত্সাহী ব্যক্তিদের সাহায্য চাহিবার কোনো কারণ থাকিতে পারে না। তাহার পরও মানবতার খাতিরে সরকার কিন্ডারগার্টেনগুলির শিক্ষক-শিক্ষিকাদের চাউল-ডাইল-তৈল প্রদানসহ আর্থিক অনুদান দিয়া যাইতেছে। তবে আমরা মনে করি, আমাদের সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলিতে ঠিকমতো পড়াশুনা হইলে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলির প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে আর থাকিবে না।
