বিশ্ব অর্থনীতির চাকা থমকে গেছে। মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বস্তির নিঃশ্বাস এখন অনেকটাই রূপকথার গল্পের মতো। করোনা ভাইরাস পৃথিবীকে কবে পরিত্রাণ দেবে তা বোধগম্য নয়। করোনা থেকে মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে দেশে দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্বে আজ ২৫০ কোটির বেশি মানুষ করোনা প্রতিরোধে ঘরবন্দি। আমাদের দেশও প্রায় তিন মাস যাবত্ কার্যত থেমে আছে। করোনা দেশ তথা বিশ্ব-অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে।
ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের সূত্রমতে, ২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আরব বিশ্বের ৫০ লাখ, ইউরোপে ১ কোটি ২০ লাখ এবং এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১২৫ কোটি পূর্ণকালীন শ্রমিকের কাজের কর্মঘণ্টা করোনার কারণে নষ্ট হবে। চীনে প্রায় ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান স্থায়ীরূপে বন্ধ। একটি পরিসংখ্যান মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্বের হার ৩০ শতাংশে পৌঁছাবে, যা ১৯৩০ সালের মহামন্দার চেয়েও বেশি। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ কোটি মানুষ বেকারত্বের ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ডেভিড বিসলের বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবার মানবসভ্যতা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন। সিরিয়া, ইয়েমেনসহ একাধিক দেশে যুদ্ধ, আফ্রিকায় পঙ্গপালের হানা, লেবানন, কঙ্গো, সুদান ও ইথিওপিয়ায় একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে করোনা মহামারি বিশ্বকে দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
করোনা ভাইরাসের কারণে হ্রাস পেয়েছে তৈরি পোশাকসহ সব ধরনের রপ্তানি বাণিজ্য। বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের অবদান ১২ শতাংশের মতো। করোনার প্রভাবে গত ২০১৯ সালের মার্চের তুলনায় প্রবাসীরা ২০২০ সালের মার্চে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৩.৩৪ শতাংশের কম। রেমিট্যান্সের প্রবাহ নিম্নমুখী। দেশের অভ্যন্তরে যানবাহন চলাচল এবং মানুষের যাতায়াত সীমিত। ফলে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। মানুষ আজ র্কমহীন ও গৃহবন্দি। দেশের ধনী ও সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া সবাই ভীষণ উত্কণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছেন। বেসরকারি খাতে অনেক ক্ষেত্রেই বেতন কমানো হচ্ছে এবং চাকরি হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার আপত্কালীন সাহায্য হিসেবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। দুর্যোগ মোকবিলায় প্রায় ৭৩ হাজার মেট্রিক টন চাল গরিব ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছে। মোট প্রণোদনার ৫ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতে বরাদ্দ করেছে। জরুরি ভিত্তিতে করোনা মোকাবিলায় ২ হাজার ডাক্তার ও ৬ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছে সরকার। এসবই সরকারের আন্তরিক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু ভীষণ উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি করোনা সংকটেও থেমে নেই স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় চিকিত্সাসামগ্রী কেনাকাটায় অন্তত ২২ কোটি টাকার সঠিক হিসাব দিতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। করোনা সংকটে সারা বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ফুটে উঠেছে। আমাদের দেশের কথা তো বলাই বাহুল্য। কিন্তু বিগত অর্থবছরগুলোতে সরকার যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম দিয়েছে তা বলা যাবে না। স্বাস্থ্য খাতে ‘জি কে শামীম’ চক্রের মতো একটি ত্রিমাত্রিক চক্র দ্বারা বরাদ্দের টাকা সব সময় লুটপাট হয়েছে। চক্রটিকে ‘ত্রিমাত্রিক’ এজন্য বললাম যে, এখানে রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ী, সরকারের অসত্ কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং অসত্ রাজনীতিবিদ। আবার সরকারঘোষিত ত্রাণ বিতরণে রয়েছে কিছু জনপ্রতিনিধি ও দলীয় ব্যক্তির দুর্নীতি ও অনিয়ম। ছেলেবেলায় রূপকথার গল্পে পড়তাম, রাক্ষসবধ অভিযানে আসা রাজকুমারের গায়ের গন্ধ পেয়ে রাক্ষসরা ‘হাউ মাউ খাউ মানুষের গন্ধ পাউ’ বলে ছুটে আসত। এখন আর রাক্ষস নেই; আছে চতুর, অনৈতিক ও ভয়ংকর স্বভাবের কিছু মানুষ, যারা সরকারি টাকার গন্ধ পেলেই বলে ওঠে—‘হাউ মাউ খাউ টাকার গন্ধ পাও’। এই হীন মনের জনপ্রতিনিধি ও দলীয় ব্যক্তিদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। এদের প্রত্যেককেই শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। তবুও নিঃশব্দে ওত পেতে থাকা এসব অসাধু স্বার্থান্ব্বেষী মানুষের জন্যই আমাদের যত ভয়। সরকারের বরাদ্দ ও প্রণোদনা সঠিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একটি বিষয়ে আমি আশাবাদী, তা হলো ব্যবসায়ীদের জন্য যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে তা মোটামুটি সঠিকভাবে বণ্টিত হবে। কারণ ব্যবসায়ীরা প্রণোদনার বিষয়ে সচেতন এবং তারা কাগজ-কলমের মারপ্যাঁচ বোঝেন। আমি চিন্তিত প্রান্তিক কৃষকদের নিয়ে। তাদের টাকা যদি স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বা ত্রাণের চাল ও তেলের মতো লোপাট হয়, তাহলে দেশ দুর্ভিক্ষে পতিত হবে। প্রান্তিক কৃষকরা নিরীহ এবং সরল। দাপ্তরিক নিয়মকানুন বা জটিলতা মেনে কোনো দালাল চক্র ছাড়া কৃষি প্রণোদনাটি তারা সময়মতো গ্রহণ করতে পারবেন কি না—এই নিয়ে আমি শঙ্কিত। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের অনেক ঋণ এমন লোক পেয়েছে, যারা কখনো গরু মোটাতাজাকরণের সঙ্গে জড়িত নয়। তাই এই ৫ হাজার কোটি টাকা বিতরণে সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। গ্রহণযোগ্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে, যাতে প্রণোদনার টাকা কৃষকদের হাতে পৌঁছায়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বারবার বলছেন, ‘এক ইঞ্চি জমিও যেন ফাঁকা পড়ে না থাকে’। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। বেশির ভাগ জমির মালিক কৃষিজীবী নয়, শিল্পপতি বা সমাজের ধনী শ্রেণির ব্যক্তি। তাদের ক্ষেত্রে কৃষিজমির ফসল খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। হয়তো ভবিষ্যতে শিল্পকারখানা গড়ার জন্য জমিগুলো তারা কিনে রেখেছেন। এরকম পতিত জমির পরিমাণ নেহাত কম নয়। এমন জমিগুলোকে চাষের আওতায় আনতে পারলে খাদ্যনিরাপত্তা আরো জোরদার হবে বলে আমার বিশ্বাস। এক্ষেত্রে সরকার স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য নিতে পারে।
ইতিহাস বলে যে কোনো মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তাই সংকট মোকাবিলায় সরকারের কৃষিসহ অন্যান্য প্রণোদনা বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনায় দেশে বেজে উঠবে দুর্ভিক্ষের ঘণ্টাধ্বনি।
n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭
