প্রায় চার বছর আগের কথা। বিস্ময় ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আবির্ভাব। ২০১৫ সালে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের নাকের-চোখের জল এক করে দিয়ে মুস্তাফিজুর রহমান দেখিয়েছিলেন বাঁ-হাতের খেল। তারপর সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা লিকলিকে গড়নের এই তরুণের গল্প ছড়িয়েছে ক্রিকেট বিশ্বের আনাচে-কানাচে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তপ্ত জমিনে ছয় মাস পার না হতেই ‘কাটার মাস্টার’ উপাধি পেয়েছেন।
গত চার বছরে মুস্তাফিজের বাহ্যিক অবয়বে, চারপাশের জগতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ২৩ বছর বয়সী এই বাঁহাতি পেসার আগের মতো অনুভূতি প্রকাশে সলজ্জ নন। সতীর্থ খেলোয়াড়, নিজের পারিপার্শ্বিকতায় আমুদে-প্রাণবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছেন। সহজাত অস্ত্র কাটার ছাড়তে, ব্যাটসম্যানকে নাকাল করতে স্কিল-বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে আরো পরিণত হয়েছেন। গণমাধ্যমের সামনে কথা বলার ক্ষেত্রে মুখের আড়ষ্টতা কমে এসেছে। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কথা খরচ করার ক্ষেত্রে আগের মতোই মিতব্যয়ী মুস্তাফিজ!
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২০১৮ সালটা এই তরুণের জন্য সবচেয়ে সফল বছর। গেল বছরে দুই ফরম্যাটে (ওয়ানডে, টি-২০) আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী এই বাঁহাতি পেসার। তিন ফরম্যাটে ৩৫ ম্যাচে ৫৭ উইকেট পেয়েছেন তিনি। অভিষেকের বছরে (২০১৫) তিন ফরম্যাটে ৩৬ উইকেট, ২০১৬ সালে ২০ উইকেট, ২০১৭ সালে ৩৫ উইকেট নিয়েছিলেন মুস্তাফিজ।
ওয়ানডেতে গত বছর ১৮ ম্যাচে ২৯ উইকেট নেন তিনি। যা বাংলাদেশের পক্ষে সেরা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৬ উইকেট মাশরাফির। মুস্তাফিজ আবার বিশ্বের ষষ্ঠ সেরা। টি-২০ তে বিশ্বে পঞ্চম তিনি। ১৩ ম্যাচে ২১ উইকেট নিয়ে দেশের মধ্যে শীর্ষে। তারপরই আছেন ১১ ম্যাচে ১৫ উইকেট পাওয়া সাকিব। টেস্টে ৪ ম্যাচে পেয়েছেন ৭ উইকেট।
২০১৮ সালে নিজের পারফরম্যান্সের মূল্যায়নে এই তরুণ বলেছেন, ‘সবমিলিয়ে সবকিছু ভালো গেছে। অনেকগুলো ম্যাচ খেলিনি পায়ের ব্যথার কারণে। তারপরও দলের জন্য কিছু ম্যাচ খেলিনি, অন্যরা খেলছে। ওই ম্যাচগুলো খেলতে পারলে আরো ১০টা উইকেট বেশি হতো।
কাটারের ধার যে পরিণত রূপ পাচ্ছে তার প্রমাণ ছিল বছর জুড়ে। সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপে আবুধাবির মরুর বুকে পায়ে ক্র্যাম্প করার পরও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে স্নায়ুক্ষয়ী শেষ ওভারে ৮ রান আটকে দিয়ে বাংলাদেশকে ৩ রানের শ্বাসরোধী এক জয় এনে দিয়েছিলেন মুস্তাফিজ। মার্চে নিদাহাস কাপের ফাইনালে ভারতের বিরুদ্ধে ইনিংসের ১৮তম ওভারে ১ রানে ১ উইকেট নিয়ে ম্যাচটা বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে এনে দিয়েছিলেন এই তরুণ।
বিসিবি একাডেমির করিডোরে দাঁড়িয়ে গত বৃহস্পতিবার মুমিনুল-সৌম্যদের খুনসুঁটি এড়িয়ে মুস্তাফিজ বলছিলেন নতুন বছরে আরো ভালো করতে চান। বলেছেন, ‘নতুন বছরে ভালো করার প্রত্যাশা থাকবে। আর ফিট থাকার। কারণ এই বছর অনেক খেলা আছে।’
আর সবার মতো আগামী জুন-জুলাইয়ের ওয়ানডে বিশ্বকাপ নিয়ে ভাবনা আছে মুস্তাফিজের মনেও। এটি হবে তার প্রথম বিশ্বকাপ। বলেছেন, ‘ওয়ানডেতে আমাদের দল তো সবসময় কম বেশি ভালো খেলতেছে। এখন ভালো রিদমে আছে সবাই। সবাই তো আশা করে যে বিশ্বকাপে ভালো কিছু করবে।’
মুস্তাফিজ আগের মতো অন্তর্মুখী চরিত্র নন। এখন বোলিং নিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলেন। তবে বোলিংয়ে নতুন নতুন বৈচিত্র্য যোগ করতে অন্তর্জাল দুনিয়ায়ও চোখ রাখেন। বলেছেন, ‘আমি সব বোলারদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। বিশেষ করে ভিডিও দেখি। টি-টোয়েন্টি খেলা হলে অনেক ভিডিও দেখি। টি-টোয়েন্টিতে অনেকে অনেক বৈচিত্র্যময় বোলিং করে। বোলিংয়ে অনেক ধরনের বৈচিত্র্য থাকে। ৫-৭ মিনিটের কিছু ভিডিও থাকে। ওইগুলোই দেখি।’
ক্রিকেটের বাইরে সময় কাটাতে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামই মুস্তাফিজের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। বন্ধুদের সঙ্গে মাছ ধরতে পছন্দ করেন। রাজশাহী কিংসের বাসে উঠার আগে বললেন, ‘ক্রিকেটের বাইরে বাড়ি যেতে ভালো লাগে। বাড়িতে সময় কাটাতে আমার খুব ভালো লাগে। বাড়িতে গেলে আমি বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাই। মাছ ধরি।’
ক্রমাগত উন্নতির চিত্র বলে মাশরাফির পরে পেস বোলিংয়ে দেশের নেতৃত্বের ব্যাটনটা মুস্তাফিজের হাতেই উঠতে যাচ্ছে।
