লঞ্চডুবির ১৩ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২০, ২১:০২

সম্প্রতি বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ১৩ ঘণ্টা পর অলৌকিকভাবে বেঁচে যান ব্যবসায়ী মো. সুমন ব্যাপারী। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অবিশ্বাস্য এক কৌতুহল ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। কীভাবে পানির ভেতরে তিনি ১৩ ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন? উদ্ধারের ঘটনায় কেউ বলছেন, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে?,’ কেউ বলছেন, নিশ্চয়ই এর পেছনে বৈজ্ঞানিক কোনো ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন জানান, সাধারণত পানির নিচে ডুবে গেলে মানুষ এক মিনিট থেকে সর্বোচ্চ দেড় মিনিটের মধ্যে অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অবশ্য ফায়ার সার্ভিসের অন্য একটি সূত্র বলেছে, লঞ্চটি পানির নিচে উলটে যাওয়ায় বাতাস আটকে এয়ার পকেট তৈরি হয়েছে এবং সেখান থেকে অক্সিজেন নিয়েই তিনি বেঁচে ছিলেন। তবে চিকিত্সকদের মতে, একটানা ৬ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ডুবে থাকলে শরীরের চামড়া, লোম, মাথার চুল, হাত-পাসহ মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যায়, চামড়া নরম হয়ে যায়। পানির নিচে ১৩ ঘণ্টা থাকার পর শরীরে যে ধরনের চিহ্ন বা লক্ষণ দেখা দেয়, উদ্ধারকৃত সুমনের শরীরে তার কোনো বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। কীভাবে তিনি ডুবে যাওয়া লঞ্চের ভেতরে ছিলেন, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ঘটনাটা আসলে সত্যি নাকি কোনো নাটক, সেটা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রহস্যের ধুম্রজাল। তবে সুমন ব্যাপারীর বর্ণনামতে, তিনি তখন ঘুমাইতেছিলেন এবং হঠাত্ একটি প্রচণ্ড ধাক্কায় তার ঘুম ভেঙে যায়। হুড়োহুড়ি শুরু হয় এবং আর কিছু খেয়াল নাই তার। তবে একটি জায়গায় রড ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানে পা পর্যন্ত পানি ছিল, কয়েক ঢোক পানিও পান করেন, অজুও করেন এবং দোয়াদরুদ পড়েন। অর্থাত্ এই কঠিন বিপদেও তিনি আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখেছিলেন। পক্ষান্তরে, প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসীর মতে, মায়ের দোয়ায় সুমন ব্যাপারী বেঁচে গেছেন। অবিবাহিত সুমন সত্তরোর্ধ্ব মাকে সেবা-শুশ্রূষা করতেন, খুব ভালোবাসতেন এবং মাকে নিয়েই নিজ বাড়িতে আলাদা থাকেন। মা-ও দুহাত তুলে সুমনের মঙ্গলের জন্য সব সময় দোয়া করেন। প্রতিদিনের মতো ঐ দিনও (সোমবার) সকালে ফজরের নামাজ শেষে মায়ের দোয়া নিয়ে কাজে বের হয়েছিলেন সুমন ব্যাপারী। ডুবন্ত লঞ্চ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর ছেলের জীবিত উদ্ধার হওয়ার সংবাদ পেয়ে নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন এবং নিহতদের পরিবারের জন্যও মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করেন সুমন ব্যাপারীর মা আমেনা খাতুন। এ যেন মায়ের দোয়াতেই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এলেন সুমন ব্যাপারী তার মায়ের কোলে। তবে ১৩ ঘণ্টার এসব ঘটনা তার কাছে কিনা মাত্র ১০ মিনিটের মতো মনে হয়েছিল। আর এখানেই হচ্ছে জনমানুষের কৌতূহলের বিষয়। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের মে মাসে জ্যাকসন-৪ নামে একটি জাহাজ আটলান্টিক মহাসাগরে ১০০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং ৬২ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার করা হয় হ্যারিসন ওকানে নামে এক নাইজেরিয়ানকে। অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ওকানের ঐ ঘটনা আজও অজানাই রয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত, হজরত ইউনুস (আ) মাছের পেট থেকে কীভাবে আল্লাহর হুকুমে উদ্ধার হয়েছিলেন, তা মুসলিম ইতিহাসে সবারই জানা। তাফসির মতে, হজরত ইউনুস (আ) নিজ শহর ছেড়ে নৌযানযোগে অন্যত্র পাড়ি দেন। কিন্তু নৌকা মাঝনদীতে যাওয়ার পর বিকল হয়ে যায় এবং ঝড়ের কবলে পড়ে। ঝড় থেকে বাঁচার জন্য প্রথমে সব মালপত্র নদীতে ফেলেও নৌকা সামলানো যাচ্ছিল না বিধায় শত্রুরা হজরত ইউনুস (আ)কে নৌকা থেকে ফেলে দিলে এক বিশাল মাছ তাকে গিলে ফেলে। হজরত ইউনুস (আ) এ সময় মাছের পেটের অন্ধকার, পানির নিচের অন্ধকার এবং রাতের অন্ধকার—এই তিন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলেন। অথচ এমন বিপদে ধৈর্য না হারিয়ে তিনি মহান আল্লাহর পবিত্র মহিমা উচ্চারণ করতে থাকেন। সুরা আম্বিয়ার ৮৭ নম্বর আয়াত অনুসারে মাছের পেটে অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকেও তিনি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখেছেন এবং ধৈর্য ধরে এই দোয়া পাঠ করেন, ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ যোয়ালেমিন’ অর্থাত্ ‘তুমি ছাড়া কোনো মাবুদ নাই, তুমি পবিত্র মহান। নিশ্চিয়ই আমি জুলুমকারীদের অন্তর্ভুক্ত। ইতিহাস ও বর্ণনামতে, তার ফরিয়াদ মাছের পেটের বাইরেও শোনা যায় এবং পানির অন্যান্য মাছ ও জলজ প্রাণী মহান আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করতে থাকে। মহান আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন এবং এভাবে তিন দিন তিন রাত মাছের পেটে থাকার পরও ঐ মাছ কোনোভাবেই তাকে হজম করতে না পেরে আল্লাহর হুকুমে তীরবর্তী একটি লাউগাছের ছায়ার নিচে বমি করে ফেলে যায়। উল্লেখ্য, পবিত্র কোরআনের সুরা সাফফাতের ১৪০-১৪৬ নম্বর আয়াতে হজরত ইউনুস (আ)-এর এই ঘটনা বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এভাবে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে নবি-রাসুলগণ কীভাবে কঠিন বিপদ-আপদ থেকে আরোগ্য লাভ করেছিলেন তার আরো অনেক বর্ণনা আছে। আসলে আল্লাহ যদি চান তিনি তার বান্দাকে বাঁচিয়ে রাখবেন, কোনো অপশক্তিই তাকে মারতে পারবে না। আর যদি আল্লাহ না চান, কোনো শক্তিই তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। তবে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নিয়ে কোনোভাবেই রহস্য বা নাটক করা কাম্য নয়। তাতে প্রকৃত ঘটনা  আড়ালে পড়ে যায়। অবশ্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে নবি-রাসুলগণের কোনো তুলনা চলে না। তবু রব্বুল আলামিন বিভিন্ন সময়ে এমন কিছু নজির স্থাপন করেন, যাতে মানুষ সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।

lলেখক :তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়