নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সচেতনতার ভূমিকাই মুখ্য

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:০৮

সহজে প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও শিশুঘাতক রোগের তালিকায় নিউমোনিয়া এখনো শীর্ষসারিতে। নিরাপদ নহে বয়স্করাও। এই বাস্তবতা বিশ্বজনীন হইলেও নানা কারণে আমাদের উদ্বেগের মাত্রা খানিকটা বেশি। প্রথমত, বিশ্বে নিউমোনিয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। দ্বিতীয়ত— দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন এবং সর্বোপরি অসচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি পালনে উদাসীনতা। এইসবের প্রতিফলন হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বত্সর গড়ে প্রায় দুই লক্ষ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তন্মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সার্বক্ষণিক সেবা ও নজরদারি সত্ত্বেও প্রায় ২০ হাজার শিশুর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয় না। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়া গত বৃহস্পতিবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, ২০১৭ সালে শুধু ঢাকা শিশু হাসপাতালেই সাড়ে তিন হাজারের বেশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশু ভর্তি হইয়াছিল। বিদায়ী ২০১৮ সালেও এই সংখ্যা ছিল আড়াই সহস্রাধিক। তবে দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলগুলির অবস্থাই অধিক শোচনীয়। দারিদ্র্র্য, অপুষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশসহ যে বিষয়গুলি নিউমোনিয়া সংক্রমণের জন্য উর্বর ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত—তাহার প্রায় সকল আলামতই সেখানে বিদ্যমান। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ও কনকনে শীতে সংক্রমণের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। অথচ নিউমোনিয়া প্রতিরোধের সকল হাতিয়ারই এখন আমাদের করায়ত্ত। বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলিয়াছেন যে, এই রোগ প্রতিরোধ, প্রতিকার ও চিকিত্সার মাধ্যমে সহজেই প্রতিহত করা সম্ভব। প্রয়োজন কেবল সচেতনতা।

ইহা সুবিদিত যে, বিগত একদশকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার পরিধি। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুধু যে প্রতিবেশী কোনো কোনো দেশকে ছাড়াইয়া গিয়াছে তাহাই নহে, স্বল্পোন্নত দেশগুলির জন্য অনুসরণীয় মডেল হিসাবেও বিবেচিত হইতেছে আন্তর্জাতিক পরিসরে। সাফল্যের তালিকা অনেক দীর্ঘ। বিশেষ করিয়া নিয়মিত টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসাবে বাংলাদেশ দুইবার ‘গ্যাভি বেস্ট পারফরমেন্স অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হইয়াছে। স্বস্তির খবর হইল, সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবাকর্মীদের মাধ্যমে অন্যসকল টিকার সহিত নিউমোনিয়ার টিকাও এখন পৌঁছাইয়া যাইতেছে ঘরে ঘরে। ঝুঁকির মধ্যে থাকা বয়স্কদের টিকাও সুলভ। অতএব, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে এখন অর্থ নহে, বড় বাধা হইল সচেতনতা। আক্রান্ত হইলেও আতঙ্কিত হইবার কিছু নাই। সময়মতো চিকিত্সকের শরণাপন্ন হইলে চিকিত্সার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময়ও সম্ভব। আর সেই চিকিত্সাও এখন নাগালের মধ্যে। এই ক্ষেত্রেও সচেতনতাই হইল মুখ্য। সময়মতো চিকিত্সা সেবা গ্রহণ না করিবার কারণেও বহু শিশুর প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটিতেছে বিশ্বব্যাপী। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে বিশ্বে ৯ লাখ ২২ হাজার শিশুর মৃত্যু হইয়াছে নিউমোনিয়ায়। তবে আশার কথা হচ্ছে, বিশ্বজুড়িয়াই নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। ফলে ২০০০ হইতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে পূর্বের তুলনায় নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর হার ৫১ শতাংশ হ্রাস পাইয়াছে— যাহা নিঃসন্দেহে খুবই তাত্পর্যবহ। আমাদের দেশেও কেবল সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই ঘাতক ব্যাধিটির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়িয়া তোলা সম্ভব। এই ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও বেসরকারি সংস্থাগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতে পারে।