একজন সত্ ও সাহসী নেতার প্রয়াণ

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:১৬

ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান ও জনপ্রিয় একজন রাজনীতিককে হারাইলাম আমরা। দুঃসময়ের মধ্যে একটি রাজনৈতিক দলে তাহার যে ভূমিকা ছিল তাহা চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে। শত বাধা-বিপত্তির মধ্যে দলীয় নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করিবার মন্ত্র আমরা পাই তাহার নিকট হইতে।  তিনি আর কেহই নন, আমাদের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কান্ডারি সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হইয়া গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত্রি নয়টায় তিনি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি যখন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইহার মধ্যেও তিনি যাহাতে তাহার নির্বাচনী এলাকা হইতে জিতিয়া আসিতে পারেন, এইজন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাহার হইয়া তাহার জন্য ভোটারদের নিকট পৃথকভাবে ভোট প্রার্থনা করেন। আজ তিনি তাহার প্রিয় জনতার ভোটে নির্বাচিত হইয়াছেন ঠিকই, কিন্তু যেদিন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করিলেন, ঠিক সেদিনই তিনি আমাদের ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন একজন সত্, নিবেদিতপ্রাণ ও সাহসী নেতা। বারবার মন্ত্রী হইলেও প্রতিবত্সরই তাহার সম্পদের পরিমাণ কমিতে থাকে বলিয়া জানা যায়।  তিনি কিশোরগঞ্জ-১ (সদর) আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করিয়া টানা পাঁচবার জয়লাভ করেন। ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ ও সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে কিশোরগঞ্জবাসী তাহার প্রতি আস্থা রাখেন। তিনি ছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। তিনি দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও রাখেন তাত্পর্যপূর্ণ অবদান । তিনি ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো এমপি হইয়া বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। অষ্টম সংসদে তিনি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। ইহার পর তিনি দুই দফায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষে তিনি ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের অন্যতম বড় পরিচয় হইল তিনি মুজিব নগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও কারাগারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তবে শুধু বাবার পরিচয়েই নহে, সততা, অমায়িক ব্যবহার ও দক্ষ নেতৃত্বের গুণে রাজনীতিতে তিনি নিজের গৌরবময় স্থান তৈরি করিয়া নিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা কারাবন্দি হইলে এই দলের যে কয়েকজন নেতা দলের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব ধরিয়া রাখিয়াছিলেন, তিনি ছিলেন তাহাদের অন্যতম। আবার তাহার পিতার নির্মম মৃত্যুর পর তিনি লন্ডনে চলিয়া যান এবং পঁচাত্তরের মহাবিয়োগান্তক ঘটনার পর লন্ডনে  অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু কন্যাদের পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়ান। তাহার এই মহত্ গুণের জন্য নিজ দলের নেতা-কর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন প্রিয়ভাজন।

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ১৯৫২ সালের পহেলা জানুয়ারি ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হইবার মধ্য দিয়াই তিনি রাজনীতিতে আসেন। আজ তাহার মরদেহ দেশে আনয়ন করা হইতেছে। তাহার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। আমরা তাহার রুহের মাগফিরাত কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।