দিলশাদুল হক শিমুল
দিনকে দিন এ দেশ উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে। মরছে কেবল দুর্ভাগা চলচ্চিত্র এবং এর সব ভাই-ব্রাদারেরা; মানে নাটক, টেলিফিল্ম এসবের কথা বলছি আর কি। একে এমন হতে হবে, অমন হতে হবে; সাধু হতে হবে না, সন্ন্যাসী হতে হবে—এ ধরনের প্রত্যাশার চাপে সবাই মিলে বিনোদনজগতের ওয়েব সিরিজ নামের নব্যজন্ম নেওয়া শিশুটিকে আঁতুড়ঘরেই গলা টিপে মেরে ফেলবেন না যেন!
দেশের যে ইন্টারনেট গেটওয়ে আছে তার ফাঁক গলিয়ে অনায়াসেই অজস্র ওয়েব কনটেন্ট ঢুকছে এ দেশে। সেটা কিন্তু প্রতিহত করা সম্ভব নয়। প্রায় সব ধরনের আধুনিক টিভির পর্দায়ই ইন্টারনেট সংযোগ থাকে। তাই প্রতিটি বাসাবাড়িতেই এসব বিদেশি সংস্কৃতির অতি চর্বিত ও উত্তেজক কনটেন্ট সবাই দেখছেন প্রতিদিন। অন্তত বিশেষ একটি প্রজন্ম তো দেখছেই। প্রতি মাসে নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজন প্রাইমের গ্রাহক ফি বাবদ বাংলাদেশ থেকে তারা যে পরিমাণ টাকা নিয়ে যায় তা জানলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে পাঠকের। এটা বন্ধ করা অসম্ভব এখন। বাংলাদেশে শিশু জন্ম নিলেই তাকে সবাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চায়। কেউ একটু অপেক্ষায় থাকে না যে পরিণত বয়সে এই শিশুটিই বেছে নিক, সে কী হতে চায়! সে তো মাশরাফির মতো ক্রিকেটারও হতে পারে অথবা পলান সরকারের মতো সাদামনের ভালো মানুষ! বহু বছর আগে তখনকার সময়ে মহান চলচ্চিত্রকার সত্যজিত্ রায় লিখেছিলেন ‘বিদেশের চলচ্চিত্র উত্সবের ছবিগুলো দেখলে এমন মনে হবে যে, ‘হয়তো এদের একমাত্র ভাবনার বিষয় যৌনতা ও যৌনতাবিষয়ক জীবন।’
তাই বলি কি, এ ধরনের ওয়েব সিরিজ নামক আধমরাকে আইনের গ্যাঁড়াকলে না ফেলে, না মেরে তাকে একটু উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করুন না সবাই মিলে! একটু শ্বাস নিতে দিন, আলো-বাতাসপূর্ণ এ পৃথিবী দেখে-চলে বড় হতে দিন না! অত ভয় কীসের! বাংলাদেশেরই কোনো না কোনো পরিবারেই থাকতে হবে তো তাকে, কত দূর আর যাবে!
নৈতিক শিক্ষা নেওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজব্যবস্থা। ক্যারিয়ার গড়ার চাপে এগুলোকে যেনতনভাবে গড়ে তুলে আমরা যদি সব দায় চাপাই কেবল সিনেমা, নাটক বা ওয়েব সিরিজের ওপর; তাহলে তা কেবল শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতোই একটি হাস্যকর ব্যাপার হবে। সহজ ভাষায় যখন টিভি নাটকের সংলাপ লেখা শুরু হলো তখন অনেকেই বলতে শুরু করলেন গেল রে গেল, ভাষা শেষ হয়ে গেল। আর হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, ‘সাধারণ এক নাটকের সংলাপের জন্য যদি কোনো ভাষা শেষ হয়ে যায়, তবে সে ভাষার শেষ হয়েই যাওয়া উচিত।’ তিনি খুব স্পষ্ট জানতেন যে, মহান এ বাংলা ভাষার কিছুই হবে না। এসব বিনোদনমাধ্যমের একটু চটুল ব্যবহার মাত্র। কিছুকাল মানুষকে নতুন পথে বিনোদিত করে মূল জায়গায় নিয়ে আসতে পথ দেখাবে।
এ দেশে একটা নতুন বিষয় পেলেই আমরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাই। ভুলে যাই একসঙ্গে থাকাতেই শক্তির বৃদ্ধি হয়, বিপরীতে হয় ক্ষয়। আপনারা সবাই বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ; এ বিষয়ে আরেকটু সদয় হোন দয়া করে। শিশু বয়সে ছোট ছোট পায়ে বাবার বুকে যে শিশু তুমুল জোরে লাথি মেরে তার আনন্দ প্রকাশ করে, তাতে একজন বাবা কতটুকু আর ব্যথা পায় বলুন; বরং আনন্দিত হয়। বাবা হেসে তাকে উত্সাহিত করে আরো শক্তি সঞ্চয় করে আরো জোরে লাথি মারতে। কারণ, বাবা চান, এ পৃথিবীতে চলার জন্য তার শিশু যেন যথেষ্ট শক্তিশালী হতে শেখে। এর মানে এসব নতুন বিনোদন মাধ্যমে যারা কাজ করছেন তাদের প্রতি সেরকম পিতৃস্নেহের পরশ দিয়ে দেখুন না কিছুকাল; কে জানে, একদিন এ শিশুই হয়তো দায়িত্বশীল সন্তান হয়ে গণমাধ্যম নামক পরিবারটিকে আগলে রাখবে। হয়তো এ শিশুরাই একদিন পিতার পায়ে কদমবুসি করে ঘর থেকে বের হবে অস্কার বা আরো বড় কোনো পুরস্কার জিততে। মনে রাখবেন, ২০১৪ সালের ১৯ অক্টোবর সামাজিক ও পারিবারিক সহিংসতা উসকে দেওয়ার দায়ে স্টার জলসা, স্টার প্লাস, জি প্লাসসহ বেশ কয়েকটি চ্যানেল বন্ধের আদেশ দেয় কোর্ট।
২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আরেক আদেশে খুলে দেওয়া হয় ঐসব চ্যানেল। এ মধ্যবর্তী সময়টাতেও বন্ধ ছিল কি ঐসব চ্যানেল? কী করেছিলাম আমরা তখন? এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ কি নিয়েছিলাম? আমাদের নিজেদের পায়ে কুড়োল মেরে নিজেদের বিনোদনব্যবস্থাকে প্রতিযোগিতার বাজারে পিছিয়ে যেতে, বন্ধ করতে আর কত অন্ধ হয়ে থাকব আমরা?
n লেখক :তরুণ চলচ্চিত্র-নির্মাতা
