দিবস
মোসা. সেলিনা আকতার
১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বে মোট জনসংখ্যা ৫০০ কোটিতে উন্নীত হয়। বিষয়টা বিবেচনায় নিয়ে UNDP-এর গভর্ন্যান্স কাউন্সিলে বছরের এই দিনটিকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বে মোট জনসংখ্যা ৭৭৮ কোটিরও বেশি। এ সংখ্যা প্রতি সেকেন্ডে পরিবর্তন হচ্ছে। প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে ২ লাখ ৫১ হাজার ১৬৪ জন নতুন শিশু। বিশ্বে গত বছরে ১.০৭% মানুষ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রথম স্থানে রয়েছে চীন। চীনের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি, দ্বিতীয় স্থানে ভারত। লোকসংখ্যা ১৩৫ কোটি, তৃতীয় স্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। লোকসংখ্যা ৩৩ কোটি। ২০১৮ সালে শীর্ষে ১০ জনবহুল দেশের তালিকায় অষ্টম স্থানে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারির তথ্যমতে বিরাটকার পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র ভূ-খণ্ডের নাম বাংলাদেশ। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশে জনসংখ্যা ১৫ কোটিরও বেশি। দেশটির প্রধান সমস্যা অতিরিক্ত জনসংখ্যা। প্রতিবছর ৩০ লাখ নতুন মুখ যোগ হচ্ছে। এভাবে বাড়তে থাকলে ২০৫০ সালে লোকসংখ্যা হবে ২৫ কোটিরও বেশি। রাস্তায় নামলে যানজটে রাস্তা ফাঁকা নেই, বাসে উঠলে বসার সিট নেই, ডাক্তারের কাছে গেলে সিরিয়াল নেই, ইন্টারভিউ দিতে গেলে পর্যাপ্ত পদ খালি নেই। এসবই একটি দেশের জনসংখ্যা বিস্ফোরণের লক্ষণ। বর্তমানে বাংলাদেশে যে একটা জনসংখ্যা বিস্ফোরণ চলছে তা চারদিকে তাকালেই বুঝা যায়। বাংলাদেশে প্রতি সেকেন্ডে জন্ম নিচ্ছে ৯ জন শিশু। আমাদের দেশে যে এখনো একটি বড় অংশের মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, তার অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো অতিরিক্ত জনসংখ্যা। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২৬৫ জন লোক বাস করে (চীনে ১৫০, ভারতে ৪৫০)। মধ্যম আয়ের স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশে এখনো ৪ কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও ২ কোটির কাছাকাছি। জীবন ধারনের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকে যারা বঞ্চিত। নীতিনির্ধারকেরা চীন ও জাপান এক সন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে বলে যে যুক্তি দেখাচ্ছে সেটি জনাধিক্যের চাপে প্রায় ন্যুব্জ বাংলাদেশের জন্য মোটেই প্রযোজ্য নয়।
তাই সর্বস্তরের মানুষকে আন্তরিকতা নিয়ে নিজ অবস্থানে থেকে ভূমিকা পালন করতে হবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে পারলেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সুখী সমৃদ্ধ স্বনির্ভর সোনার বাংলা গড়ার পথ সুগম হবে। এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য ম্যালথাসের সেই অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী ‘কোনো দেশে জনাধিক্য দেখা দিলে সে দেশ যদি তা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় তবে দুর্ভিক্ষ, মহামারি, প্লাবন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিবে যা হয়তো জনসংখ্যাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে’। ম্যালথাসের এই বাণী বর্তমান বিশ্ব করোনা মহামারিতে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছে।
অতিরিক্ত জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাহিদা। আর প্রকৃতির বুকে তাদের অবাধ বিচরণে ধরিত্রীমাতা যখন হাঁপিয়ে উঠেছে, জীববৈচিত্র্য রক্ষার আলোচনায় মানুষের অতি প্রয়োজনীয়তা বাদ সাধছিল। তখন ম্যালথাসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ধরিত্রীমাতাকে রক্ষার দায়িত্ব তুলে নিল কোভিড-১৯ নামক অতিক্ষুদ্র একটি ভাইরাস। কোভিড-১৯-এর তাণ্ডবে সারাবিশ্বের মানুষ যখন দিশেহারা, শক্তিমান রাষ্ট্রগুলো যখন অসহায় তখন প্রকৃতি যেন আপন মনে হাসছে। নিজের রূপের পসরা সাজিয়ে বসছে। প্রকৃতির এমন রূপের মহিমা পৃথিবীর মানুষ যেন দেখেনি কত যুগ, কত কাল! এই বাস্তবতা থেকে নতুন করে শিখতে শুরু করছে মানুষ। তারা উপলব্ধি করতে শিখছে যে, ধরিত্রীমাতার পরিবারে থাকবে নিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা আর ধরিত্রীমাতার বুকে হবে তাদের সুনিয়ন্ত্রিত বিচরণ। তবে এই শিক্ষা করোনার পরও থাকবে কি না সেটাই আজকের প্রতিপাদ্য বিষয়। আমরা শুধু করোনাকালীন সময়ে নয়, সারা বছর সমুদ্র উপকূলে ডলফিনের অবাধ বিচরণ আর বালুকাময় তটে Ipomoea pescaprae (বীচমর্নিং গ্লোরি ফুল)-এর মন মাতানো হাসি দেখতে চাই। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পৃথিবীর সব দেশের মানুষ ও সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মৌলিক সিদ্ধান্তে ঐকমত্যে পৌঁছানো এবং তা প্রত্যেককে কঠোরভাবে মেনে চলা।
n লেখক :সহকারী অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, পটুয়াখালী সরকারি কলেজ, পটুয়াখালী
