মানুষ কতোটা মানুষের জন্য

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২০, ২১:৫৯

মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘গোলাপ যেমন একটি বিশেষ জাতের ফুল, বন্ধু তেমন একটি বিশেষ জাতের মানুষ।’ বিপদের সময় অসহায় মুহূর্তে এসব বিশেষ জাতের মানুষের পরিচয় মেলে। যে কোনো পরিস্থিতিতে যে কেউ অন্যের মুখাপেক্ষী হতে পারে। যেমন, বিপদগ্রস্ত হলে কেউ সাহায্যপ্রার্থী হতে পারে, তেমনি মৃতের সত্কারে অপরের সহায়তার প্রয়োজন হয়। একমাত্র মানবজাতির বিবেকবোধ বা ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা রয়েছে। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ হলে সেবা করা, অভুক্ত হলে পানাহার করানো, সংকটে পড়লে সমাধান করা, বিবাদ হলে মীমাংসা করা, মৃত্যু হলে সম্মানের সঙ্গে শেষকৃত্য করা, সবসময় নিজের সঙ্গে অপরের মঙ্গলও কামনা করা—বিভিন্নভাবে মানবতার প্রকাশ পায়।

করোনা মহামারির এ সংকটকালে ডাক্তার-নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসনসহ যাঁরা ফ্রন্ট লাইনে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা মানবতাকে সমুন্নত করছেন নিঃসন্দেহে। একইভাবে শেষকৃত্যে যাঁরা স্বেচ্ছায় ভূমিকা রাখছেন, সরাসরি সহযোগিতা করছেন, তাঁরা মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্ব যথাযথভাবে প্রকাশ করছেন। তাই স্বেচ্ছাসেবীদেরও যথাযথ মূল্যায়ন ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা উচিত। এর ফলে ভবিষ্যতে যে কোনো দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করতে উত্সাহিত হবেন।

এসব প্রকৃত মানুষদের চিনে রাখুন, শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করুন, তাঁদের মানবিক কাজে সহায়তার হাত বাড়ান। একইসঙ্গে যারা মানুষের রূপ ধারণ করে অমানুষের মতো আচরণ করছে, যারা দুর্যোগ মুহূর্তের সুযোগ নিচ্ছে, অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুদ করে দাম বাড়াচ্ছে, ওষুধের দাম বেশি নিচ্ছে, প্রয়োজনীয় মাস্ক-গ্লাভস, হ্যান্ড সেনিটাইজার সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধি ও সার্জিকেল সামগ্রী নকল করে বাজারজাত করছে—সেইসব মানবরূপী পশুদেরও চিনে রাখুন। পবিত্র কোরআনে এ শ্রেণির লোকের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তারা (মানুষ হয়েও) পশুর মতো, বরং পশুর চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭৯)

সারা বিশ্বে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। করোনা আক্রান্ত হয়ে বা করোনা উপসর্গ নিয়ে কেউ মারা গেলেই তার লাশ দাফনে বা সত্কারে এগিয়ে আসছে না কেউ। মুহূর্তে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই যেন পর হয়ে যাচ্ছে! রক্তের বন্ধন, আত্মার বন্ধন, সামাজিক বন্ধন সবই যেন মিথ্যা। সন্তান বাবা-মায়ের লাশ ধরছে না, স্ত্রী স্বামীর লাশ ফেলে চলে যাচ্ছে, স্বামী স্ত্রীর লাশ সত্কারে এগিয়ে আসছে না, প্রতিবেশীরা লাশ দাফনে বাধা দিচ্ছে, ইমাম সাহেব জানাজা পড়াতে অস্বীকার করছে। সবাই আমরা থেকে আমিতে গিয়ে মিশেছি।

অথচ করোনায় মৃতের শরীর থেকে করোনা ছড়ানোর কোনো তথ্য এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবেই বলেছে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির লাশ থেকে অন্য কেউ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার একটি ঘটনাও ঘটেনি। এটি কেবল সর্দি-কাশির ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। মৃত ব্যক্তি যেহেতু হাঁচি বা কাশি দিতে পারে না, ফলে ড্রপলেট আসার সুযোগও থাকে না। আর ড্রপলেট না বেরোলে ভাইরাস ছড়াবে কিভাবে! এ প্রসঙ্গে থাইল্যান্ডের ডিপার্টমেন্ট অব মেডিক্যাল সার্ভিসেসের ডিরেক্টর ড. Somsak Akhasilp ব্যাংকক পোস্টকে বলেছেন, হোস্ট (মানব শরীর) মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে তার দেহের ভেতরে থাকা ভাইরাসেরও মৃত্যু ঘটে। সে আর বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। গবেষকদের মতে, ভাইরাস সবসময় জীবিত প্রাণীর দেহের জীবিত কোষে প্রবেশ করে বংশবৃদ্ধি করে। মৃত কোষের ভেতরে সেও মৃত ভাইরাস।

চট্টগ্রাম